ঢাকার কাওরানবাজার এলাকা। সকালের আলো ফুটতেই যেখানে পাইকারি সবজি বাজারের হাক ডাকে জমে ওঠে চারপাশ, সেই একই জায়গা দুপুরের মধ্যে বদলে যায় এক ব্যস্ত করপোরেট অঞ্চলে। প্রতিদিন হাজারো পেশাজীবী, শ্রমজীবী ও পথচারী এখানে আসেন জীবিকার টানে। খরচ ও সময় সংকুলান না হওয়ায় ক্ষুধা নিবারণে বাধ্য হয়েই তারা ছুটে যান আশপাশের নামহীন, মানহীন খাবারের দোকানগুলোতে। কিন্তু এই যেসব খাবার দিয়ে তারা ক্ষুধা মেটাচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ?
গবেষণা বলছে, কারওয়ানবাজারের মতো রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন করপোরেট এলাকার চাপা কোলাহলে বিক্রি হওয়া এসব খাবার মুহূর্তের জন্য তৃপ্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরে তৈরি করছে মারাত্মক প্রভাব।
গত বছর রাস্তার পাশের ও রেস্তোরাঁর খাবার নিয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ সায়েন্স’র প্রধান বিজ্ঞানী মো. লুতফুল কবীর।
গবেষণায় উঠে এসেছিল, রাজধানী ঢাকার পথখাবারে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর উপস্থিতির প্রমাণ। এমনকি রেস্তোরাঁর মিক্সড সালাদেও পাওয়া গেছে ই-কোলাই, ভিবরিও এসপিপি ও সালমেনেলার মতো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া।
একই চিত্র পাওয়া গেছে ২০২৪ সালে ঢাকার রাস্তার খাবার নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক এক গবেষণায়। শহরের এসব খাবারে ইশেরিকিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা, পসিউডোমোনাস, ভাইব্রিও এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াসের মতো প্যাথোজেনের উপস্থিতির প্রমাণ পায় তারাও।
এসবের উপস্থিতির পরিমাণ যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় দশ–বিশ গুণ পর্যন্ত বেশি, তাও হয় আরও স্পষ্ট। আরও উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, এসব জীবাণুর কিছু প্রজাতি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসাকে করে তুলতে পারে আরও কঠিন।
পর্যবেক্ষণ বলছে, খাবারে এই দূষণের কারণ লুকিয়ে আছে খাবার তৈরির প্রতিটি ধাপেই। অপরিচ্ছন্ন পানি ব্যবহার থেকে শুরু করে রান্না, সংরক্ষণ, সরবরাহ সব পর্যায়েই ঝুঁকি যোগ হয়। বিক্রেতার নোংরা হাত বা গামছা, বারবার ব্যবহার করা অপরিষ্কার প্লেট, বস্তার কাগজ, আশপাশের মাছি ও ধুলাবালি সহজেই খাবারে জীবাণু ছড়াচ্ছে। এসব অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই ডায়রিয়া, কলেরা, জন্ডিসের মতো মারাত্মক পানিবাহিত রোগসহ অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বহুগুন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, খাদ্যবাহিত জীবাণুর কারণে বিশ্বে বছরে দুই শ’ কোটি রোগের ঘটনা ঘটে। আর মারা যায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ।
দীর্ঘদিন রাস্তার পাশের ছোট হোটেলে অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়া ভুক্তভোগীদের একজন সাংবাদিক প্রমিতি প্রভা চৌধুরী। ব্যস্ত অফিস জীবনে তার দিনের প্রথম খাওয়া শুরু হতো অফিসের সামনের একটি হোটেলের খাবার দিয়ে। এসব খাবারের মান নিয়ে নিশ্চিন্ত না থাকলেও স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই প্রতিদিন সেখানকার খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন।
এসব খাবার খেয়ে ধীরে ধীরে শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করতে থাকেন প্রমিতি প্রভা। পেটের অস্বস্তি, বুক জ্বালা, খাবারের প্রতি অনীহা-এসব সমস্যা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। স্বাস্থ্যের এই অবস্থা তার কর্মজীবন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস মেনে চলার মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেছেন। তবে তার জীবনে থেকে যায় দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ছাপ।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, উন্মুক্ত পরিবেশে রাখা খাবার, অপরিচ্ছন্ন পানির ব্যবহার এবং দিনের পর দিন একই খাদ্য উপাদান পুনর্বিক্রির অভ্যাস এসব খাবারকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
তিনি জানান, অনেকেই আগের দিনের অবিক্রীত খাবার না ফেলে পরের দিনও বিক্রি করে। এতে দূষণের মাত্রা আরও বাড়ে। এ ধরনের খাবার মানুষের খাদ্যনালীর জন্য উপযোগী নয়।
অন্যদিকে, দেশের খাদ্য-নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে গত এক দশকে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের দুর্বলতা এখনো বিদ্যমান। নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়ন ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) গঠনের পরেও রাস্তার খাবারের ওপর দৃশ্যত কোনো নজরদারি নেই।
দুই বছর আগে বিএফএসএ’র পরিচালক সহদেব চন্দ্র সাহা স্বীকার করেছিলেন, রাস্তার খাবারের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যত কোনো বড় কাজ হয়নি। কয়েকটি এলাকাভিত্তিক পরিদর্শন ছাড়া কার্যক্রম ন্যূনতম পর্যায়েই রয়ে গেছে। অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালতের কিছু কার্যক্রম চোখে পড়লেও সিটি করপোরেশনের স্যানিটারি টিম বা খাদ্য পরিদর্শন বিভাগের কার্যকারিতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
তবু মানুষ কেন এসব খাবার খায়?
বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার চেয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যের দাম অনেক বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন মানুষের পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যয় প্রতি বেলায় ৮৩ থেকে ২৭৬ টাকা। কিন্তু দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ পরিবারই এই ব্যয় বহন করতে পারে না।
এ প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ‘ফোরসাইটফোরফুড’–এর এক পলিসি ব্রিফে। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশের বহু মানুষেরই চাহিদামাফিক পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। এই প্রতিষ্ঠানের মতে, বর্তমান খাদ্যব্যবস্থা পরিবর্তন ও পুষ্টি সংবেদনশীল নীতি গ্রহণ ছাড়া স্বাস্থ্যকর খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আনা কঠিন। ফলে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো ‘স্বাস্থ্যকর’ খাদ্য গ্রহণে অক্ষম। নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারের আয়ের সঙ্গে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির অসামঞ্জস্যের কারণে স্বাস্থ্যকর খাদ্য অনেকের জন্যই দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে।
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ যখন যাতায়াত, বাসাভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ সামাল দিতে হিমশিম খায়, তখন স্বল্পমূল্যের অস্বাস্থ্যকর খাবারই তাদের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে।


