আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সড়ক, রেল ও নৌপথে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে সরকারের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
শুক্রবার ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন শেষে রেলমন্ত্রী রবিউল আলম বলেন, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে রেলওয়ে বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করেছে এবং বিশেষ ট্রেন চালু করেছে, যাতে যাত্রীরা স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারেন।
তিনি জানান, আন্তঃনগর সার্ভিসে ১২৪টি মিটারগেজ ও ১৪টি ব্রডগেজ কোচ অতিরিক্ত সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়া, নিয়মিত ট্রেনের পাশাপাশি পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করছে রেলওয়ে। সড়ক ও নৌপথেও সুশৃঙ্খলভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শুরু হওয়া ঘরমুখো মানুষের যাত্রা এখন পর্যন্ত মোটামুটি স্বস্তিদায়ক। অনলাইনে টিকিট বিক্রির সময় যাত্রীদের ব্যাপক চাপ থাকলেও সবাই ন্যায্যভাবে টিকিট পেয়েছেন এবং যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
অনলাইনে অগ্রিম ট্রেনের টিকিট বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘৩ তারিখ থেকে ধারাবাহিকভাবে টিকিট বিক্রি শুরু হয়। এ সময় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ টিকিট কেনার চেষ্টা করেন। রেলের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রায় ৩৬ হাজার টিকিট বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। টিকিট বুক করার পর নির্দিষ্ট সময় পেমেন্টের সুযোগ থাকায় অনেক সময় অন্যদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।’ তবে শেষ পর্যন্ত যারা টিকিট কিনতে চেয়েছেন, তারা ন্যায্যভাবে টিকিট পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
রেলমন্ত্রী জানান, ঈদযাত্রার প্রথম দিনে ২১টি ট্রেন নির্ধারিত গন্তব্যে ছেড়ে গেছে এবং অধিকাংশই সময়মতো চলেছে। দুটি ট্রেন প্রায় ৪০ মিনিট দেরিতে ছেড়েছে। একটি দুর্ঘটনার কারণে ওই ট্রেনগুলো কয়েক দিন ধরে প্রায় তিন ঘণ্টা দেরি করছিল, যা কমিয়ে এখন ৪০ মিনিটে আনা সম্ভব হয়েছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে ট্রেন দুটি নির্ধারিত সময়েই ছাড়তে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্টেশনে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি সন্তুষ্টির কথা শুনেছেন বলেও জানান মন্ত্রী। তবে ভবিষ্যতেও এই সেবার মান বজায় থাকবে কি না–এ নিয়ে যাত্রীদের উদ্বেগ রয়েছে।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে যাত্রীরা যে সেবার মান দেখছেন, তা যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে চায় সরকার এবং ভবিষ্যতে এ সেবার মান আরও উন্নত করা হবে।’

রবিউল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী রেল যোগাযোগকে যুগোপযোগী ও জনবান্ধব করতে নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে মানুষ স্বল্প সময়ে স্বাচ্ছন্দ্যে দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াত করতে পারেন। সে লক্ষ্যেই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে কাজ করছে সরকার।’
ঈদযাত্রার শেষ মুহূর্তে কিছু যাত্রী ট্রেনের ছাদে ওঠার চেষ্টা করেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘এ প্রবণতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বিপুল যাত্রীর চাপে কখনো কখনো দুই-একজন ছাদে উঠে যেতে পারেন। শতভাগ নিশ্চিত করা কঠিন হলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে কেউ ছাদে উঠতে না পারে।’
তিনি বলেন, ‘মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়েন। এত স্বল্প সময়ে এত মানুষের যাতায়াত বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলেও সরকার তা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কোচ, বাস ও নৌযান যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে বাস ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার দিকেও সরকার কাজ করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও জানান মন্ত্রী।
ট্রেনের শিডিউল স্বাভাবিক রাখতে অন্তত ৮৫ থেকে ৮৭টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে ৭৮টি লোকোমোটিভ যুক্ত করা গেছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে আরও কয়েকটি যুক্ত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে পুলিশের পাশাপাশি নিয়মিত পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, নৌপুলিশ এবং বিভিন্ন জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি আনসার সদস্য ও বিশেষ জ্যাকেট পরিহিত স্বেচ্ছাসেবকদেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতি ৫০০ মিটার পরপর তাদের অবস্থান থাকবে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ছয় লেনের কাজ চলমান থাকলেও অন্তত দুটি লেন দিয়ে যান চলাচল অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এতে যানবাহন ধীরগতির হতে পারে, তবে কোথাও থেমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ঈদযাত্রার সময় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বা সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়ার জন্য প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। যাত্রীদের ধৈর্য ও সহযোগিতার আহ্বানও জানান তিনি।
পরে রেলমন্ত্রী মতিঝিল বিআরটিসি বাস ডিপো পরিদর্শন করেন। এ সময় ডিপোর পরিচ্ছন্নতা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন এবং ঈদ উপলক্ষে বিআরটিসির বাসসমূহ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।
পরিদর্শনের সময় রেলপথ মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


