রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সমাধান ও গতিপ্রকৃতি রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মিয়ানমারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান। শাহজাহান চৌধুরী ২০২৪-২৫ সালে প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি, সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও মানবিকসংকট মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জটিল ও বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক বিষয়। রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিনের জাতিগত সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অনিরাপদ পরিবেশে কাউকে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। তবে সরকার রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করতে সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত রাখা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা না গেলেও উপযুক্ত সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন করাই সরকারের লক্ষ্য।
খলিলুর রহমান জানান, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন রোহিঙ্গার মধ্যে মিয়ানমার এ পর্যন্ত ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জনকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ছয়টি ধাপে মোট ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য পাঠিয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমার ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৩ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসনের কার্যক্রমও চলছে। আইওএম-এর মাধ্যমে ৫ হাজার ৭১২ জন এবং আইআরসি’র মাধ্যমে ৬৯৭ জন রোহিঙ্গাকে উন্নত দেশে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-এপ্রিলের মধ্যে আইওএম-এর মাধ্যমে ১৯১ জন কানাডা, যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডে এবং আইআরসি’র মাধ্যমে ১৪৫ জন অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসিত হয়েছেন। তবে রাখাইনে স্থায়ী ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) অনুযায়ী এই সংখ্যা এখন ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন।
তিনি বলেন, ‘অতীতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। তারা মানবিক বিপর্যয়কে পুঁজি করে দাতা দেশ থেকে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। নিজেদের দুর্নীতি থেকে দৃষ্টি সরাতে এই ইস্যু ব্যবহার করায় সংকট আন্তর্জাতিক এজেন্ডা থেকে স্থানচ্যুত হয়।’
মন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইস্যুটি আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় ফেরানো। সরকারের আমন্ত্রণে ২০২৫ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশ সফর ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে স্টেকহোল্ডার কনফারেন্সে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৭টি দাবি উত্থাপন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
মন্ত্রী আরও জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে ওআইসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ রেজুলেশন সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। বিশ্বের ১০৫টি দেশ এতে কো-স্পন্সর করে। বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে গাম্বিয়ার মামলায় সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই কূটনৈতিক প্রয়াস আরও জোরদার করা হয়।
ক্যাম্পের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র রোধে বিশেষ টাস্কফোর্স যৌথ অভিযান চালাচ্ছে। ক্যাম্পের জন্য ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৩ সালে খুনের ঘটনা ৬৬টি হলেও ২০২৪ সালে তা ৪৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৫টিতে নেমে আসে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এই সংখ্যা মাত্র ৬টি।


