চাকরিতে ১০ম গ্রেডে বেতন-ভাতাসহ তিন দফা দাবিতে রোববার থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা।
শনিবার সন্ধ্যায় শাহবাগে ‘কলম বিসর্জন’ কর্মসূচিতে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে এই কর্মবিরতির ঘোষণা দেন ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর সভাপতি আবুল কাশেম।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।’
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বিকালে শাহবাগে ‘কলম বিসর্জন’ কর্মসূচি পালনের জন্য তারা একসঙ্গে হলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় পাঁচ থেকে ছয়জন শিক্ষককে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ।
প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, পুলিশের লাঠিচার্জে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষক আহত হয়েছেন।
‘অনেকের অবস্থা গুরুতর, কারও পা ভেঙেছে, কারও চোখে আঘাত লেগেছে। আহতদের অনেককেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে’, বলেন তিনি।

শিক্ষকদের অভিযোগ, তারা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করছিলেন, কিন্তু বিনা উসকানিতে পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালায়।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আন্দোলনকারীরা প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করায় তাদের বাধা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালিদ মনসুর বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ থেকে ছয়জন শিক্ষককে থানায় আনা হয়েছে।’
অন্যদিকে রমনা জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম জানান, আন্দোলনকারী শিক্ষক নেতাদের বুঝিয়ে শহীদ মিনারে ফেরত পাঠানো হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ একদল শিক্ষক ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে। তখন তাদের সরিয়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।
শিক্ষকদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনার বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (গণমাধ্যম) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এক বিবৃতিতে জানান, এদিন বিকাল ৪টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শাহবাগে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে।

এদিকে দুপুরে খুলনায় এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার আন্দোলনরত শিক্ষকদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড দেওয়া হয়েছে। সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এখন তারা ১০ম গ্রেড দাবি করে যে আন্দোলন করছে, তার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির বিষয়ে সহকারী শিক্ষকদের দাবির ব্যাপারেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একমত নয়। সরকারের নীতি হলো ৮০ শতাংশ পদে বিভাগীয় পদোন্নতি এবং ২০ শতাংশ পদে নতুন নিয়োগ।’
মূলত তিন দাবিতে শুক্রবার রাত থেকে শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন শিক্ষকরা। দাবিগুলো হলো–সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের চাকরি ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা, প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতি দেওয়া এবং চাকরির ১০ম ও ১৬তম বছরে উচ্চতর গ্রেডের নিশ্চয়তা।
‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এ যুক্ত চারটি সংগঠন হলো–প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম-শাহিন), প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি, প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (শাহিন-লিপি) এবং সহকারী শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদ।

প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো আমরা ১৩তম গ্রেডে বেতন পাচ্ছি। এতে জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে উঠেছে।’
অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রধান শিক্ষকদের চাকরি ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম থেকে ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে পে কমিশনে আলোচনাধীন রয়েছে।
আন্দোলনের শুরুর দিকে শিক্ষকরা জানান, সরকার যেন দ্রুত ১১তম গ্রেডের গেজেট দেয়, সেজন্যই তারা ১০ম গ্রেডের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। ১১তম গ্রেডের প্রজ্ঞাপন জারি হলেই শিক্ষকরা খুশি মনে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাবেন বলেও জানান।


