রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো নিরাপত্তা শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. জাহেদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এমন বহুমাত্রিক নজরদারি রয়েছে যে এখানে একাধিক স্বাধীন নিরাপত্তা স্তর কাজ করে এবং একটি ব্যবস্থা কোনভাবে ব্যর্থ হলেও অন্যগুলো সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারবে।’
মঙ্গলবার বিকালে ইউনিট-১ এ জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি শুরু করে রূপপুর কেন্দ্র।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাহেদুল হাসান বলেন, ‘বিদ্যুৎ বা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াও রিয়্যাক্টর দীর্ঘ সময় নিরাপদ থাকতে পারে। এই আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হলো ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর, যা রাশিয়ার রোসাটমের তৈরি জেনারেশন ৩+ প্রযুক্তি। এটি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) “ডিফেন্স ইন ডেপথ” নীতির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।’
নীতিটি ধারণায় সহজ হলেও বাস্তবে অত্যন্ত জটিল মন্তব্য করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘এতে একাধিক স্বাধীন নিরাপত্তা স্তর থাকে, ফলে একটি ব্যবস্থা ব্যর্থ হলেও অন্যগুলো সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে নেয়।’
প্রকল্পের শুরু থেকেই যুক্ত থাকা জাহেদুল হাসান জানান, রিয়্যাক্টরের ওপর ৭০০টির বেশি স্বয়ংক্রিয় ইন্টারলক সার্বক্ষণিক নজরদারি চালায়।
‘কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সিস্টেম নিজেই প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রয়োজনে রিয়্যাক্টরকে স্থিতিশীল করে বা বন্ধ করে দেয়’, যোগ করেন তিনি।
জানান, জাপানের ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক কেন্দ্রের দুর্ঘটনা থেকে নেওয়া শিক্ষাও এই নকশায় প্রতিফলিত হয়েছে। ডাবল কনটেইনমেন্ট, কোর ক্যাচার এবং হাইড্রোজেন রিকম্বাইনারের মতো ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে, যাতে বিস্ফোরণ বা তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার মতো চরম পরিস্থিতিও প্রতিরোধ করা যায়।
জাহেদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের অগ্রাধিকার হলো কোনোভাবেই তেজস্ক্রিয়তা যেন পরিবেশে না ছড়ায়। পাশাপাশি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও রাখা হয়েছে। সাইবার বা ডিজিটাল আক্রমণ থেকেও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।’
তবে এত উন্নত প্রযুক্তির রিয়্যাক্টর হলেও একটি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর এর কার্যকারিতা নির্ভরশীল। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘বেস লোড’ সরবরাহকারী হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি বজায় রাখা জরুরি।
‘গ্রিড অস্থির হলে আমরা পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দিতে পারব না। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে গ্রিড উন্নয়নের কাজ চলমান’, বলেন তিনি।
পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করতে এরইমধ্যে এক হাজারের বেশি জনবল প্রশিক্ষণ পেয়েছে জানিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘অনেকেই রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং কিছু কর্মী গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম পরিচালনার লাইসেন্সও পেয়েছে। তবে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হতে সময় লাগবে।’
‘নতুন দেশ হিসেবে পূর্ণ দক্ষতা অর্জনে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। আমাদের ভিত্তি তৈরি হয়েছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা আসবে বাস্তব পরিচালনার মধ্য দিয়ে’, জাহেদুল হাছান।
বর্তমানে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা থাকলেও ভবিষ্যতে দেশীয় জনবল দক্ষ হয়ে উঠলে পরিচালন ব্যয় কমে আসবে বলেও জানান তিনি।
বলেন, ‘এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পথ সহজ ছিল না। প্রকল্পের অর্থায়ন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, যা শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার সহায়তায় সমাধান হয়। পদ্মা নদীর তীরবর্তী নরম মাটিতে নির্মাণও ছিল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ, যা উচ্চচাপ সিমেন্ট ইনজেকশনের মাধ্যমে “সেমি-রক” ভিত্তি তৈরি করে সমাধান করা হয়েছে।’
‘কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়েছে। এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থা ও আর্থিক লেনদেনে বিঘ্ন ঘটালেও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে’, যোগ করেন জাহেদুল হাসান।
তিনি জানান, পারমাণবিক কেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থাপনাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির আওতায় পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। ব্যবহৃত জ্বালানি প্রথমে নিরাপদে কেন্দ্রেই সংরক্ষণ করা হবে, পরে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের জন্য ফেরত পাঠানো হবে।
তবে জাহেদুল হাছান জোর দিয়ে বলেন, ‘নিরাপত্তা কোনো শেষ হওয়া প্রক্রিয়া নয়। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ- সবই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরো জীবনচক্র জুড়ে অব্যাহত থাকবে।’


