ওয়ানডে ম্যাচ বলে মিরপুর স্টেডিয়ামের গ্যালারি ঠাঁসা দর্শক নেই। অনেকেই বেরিয়ে গেছেন ম্যাচ শেষ হওয়ার বেশ আগেই। তবে যারা শেষ পর্যন্ত ছিলেন, তাদের পয়সা পুরোই উসুল। মঙ্গলবার তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশের দেয়া ২১৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৯ উইকেট ২১৩ রান। ম্যাচ হয় টাই, খেলা গড়ায় সুপার ওভারে। সব মিলিয়ে ৮১৩ ম্যাচ খেলার পর বাংলাদেশের প্রথম সুপার ওভার। অবশ্যই ওয়ানডেতে প্রথমবার।
সুপার ওভারে ১১ রান তাড়া করতে নেমে অতিরিক্ত থেকেই বাংলাদেশ পায় তিন রান। তবুও থেকে গেছে দুই রানের ব্যবধান। অতিরিক্ত ও সিংগেল-ডাবলস মিলিয়ে তুলতে পেরেছে মাত্র ৯ রান। হারিয়েছে সৌম্য সরকারের উইকেটও। শেষ বলে তিন রান লাগত জয়ের জন্য। সাইফ হাসান শট খেললেও শর্ট থার্ড ম্যান থেকে এক রানের বেশি পাননি। সুপার ওভারে ম্যাচ জিতে সিরিজে ১-১ সমতায় ফিরল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আগামী ২৩ অক্টোবর সিরিজের শেষ ম্যাচ তাই অঘোষিত ফাইনাল।
এর আগে সুপার ওভারে ব্যাট করতে নেমে মোস্তাফিজুর রহমানের বলে এক চার, একটি ডাবল নেন ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক শাই হোপ। যদিও ক্যাচ দিয়ে কভারে মিরাজের হাতে জীবন না পেলে আরো কমে আটকে থাকতে পারত উইন্ডিজ। দ্বিতীয় বলে ব্র্যান্ডন কিংয়ের উইকেট হারিয়েও ১১ রান করে তারা।
যদিও সুপার ওভারের নাটকীয়তায় যাওয়ার আগে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে চলেছে স্পিন শো। অবশ্য মিরপুরের উইকেট স্পিন ফ্রেন্ডলি বরাবরই। তার মানে এই নয় যে, পেসারদের কোনো ভূমিকা থাকবে না। এই মাঠে একটা সময় চার পেসারও খেলিয়েছে। তবে দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচে একমাত্র পেসার ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। করেছেন ৮ ওভার। বাকি ৪২ ওভার করেছেন স্পিনাররা মিলে। সব মিলিয়ে দুই দলের স্পিনাররা করেছেন ৯২ ওভার, যা কোনো এক ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ।
রান তাড়ায় নেমে ১০৩ রানের মধ্যে পাঁচ উইকেট হারানো উইন্ডিজের শেষের আশা হয়ে টিকে ছিলেন হোপ। তার ফিফটিতেই ম্যাচ সুপার ওভারে নিয়ে যায় ক্যারিবিয়ানরা। ৬৭ বলে ৫৩* রানে অপরাজিত থাকেন এই ডানহাতি ব্যাটার।
ইনিংসের প্রথম ওভারের তৃতীয় বলেই এলবিডব্লিউ হন ব্র্যান্ডন কিংস। দুদিন আগে স্কোয়াডে যুক্ত হওয়া স্পিনার নাসুম আহমেদের বলে, রিভিউ নিয়েও হয়নি রক্ষা। টপ অর্ডারের বাকি দুই ব্যাটার আলিক আথানেজ ও কেসি কার্টিও ফিরেছেন টার্নে পরাস্ত হয়ে। দুই ব্যাটারকেই ফিরিয়েছেন রিশাদ হোসেন। আথানেজ ২৮ ও কার্টি করেন ৩৫ রান। অভিষিক্ত আকিম অগাস্টে ২৯ বলে ১৭ রান করে উইকেট দিয়েছেন বাঁহাতি স্পিনার তানভীর ইসলামকে। শারফেন রাদারফোর্ড তার দ্বিতীয় শিকার।
গুদাকেশ মোতি দুটো বাউন্ডারি মেরে ইনিংস বড় করার যা একটা সম্ভাবনা দেখিয়েছিলেন, সেটাও মিইয়ে গেছে রিশাদের সোজা বল মিস করে বোল্ড হওয়ার পর। রোস্টন চেইজ ১১ বলে ৫ রান করে পরিণত হয়েছেন নাসুমের দ্বিতীয় শিকারে।
মিরপুরের স্পিন ট্র্যাকে এর আগে যা হয়েছে, ওয়ানডে ক্রিকেটে তা কখনোই দেখা যায়নি। পুরো ৫০ ওভারের সবকয়টিই করেছেন স্পিনাররা। বাঁহাতি স্পিনার আকিল হোসেনকে দিয়ে বোলিং শুরু, অপর প্রান্তে রোস্টন চেইজ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথমবার, দুই প্রান্তেই বোলিং শুরু হয়েছে স্পিন দিয়ে। অবশ্য মিরপুরের স্পিন সহায়ক উইকেটে প্রথম ম্যাচে যা হয়েছে, এরপর স্পিনে শক্তি না বাড়িয়েও উপায় ছিল না তাদের।
আকিলের সাথে চেইজ, খারি পিয়েরে, গুদাকেশ মোতি আর আলিক আথানেজ মিলে করেছেন ৫০ ওভার। তাদের মধ্যে আকিল, দলের সাথে যোগ দিয়েছেন গতকাল রাত আড়াইটায় আর ইনিংসের প্রথম বল করতে নেমে গেছেন দুপুর দেড়টায়। একাদশে দুই পার্ট টাইম পেসার থাকলেও তাদের বল করাননি শাই হোপ। বরং পার্ট টাইম আথানেজকে করিয়েছেন ১০ ওভার। তিন মেইডেনসহ মাত্র ১৪ রানে দুই উইকেট নেন এই অফস্পিনার। অথচ এর আগে নিজের খেলা ১৪ ম্যাচে সব মিলিয়ে চার ওভার বল করেছেন তিনি।
প্রত্যাশিতভাবেই বাংলাদেশি ব্যাটাররা খাবি খেয়েছেন স্পিনে। সাইফ হাসান ফিরেছেন দলীয় ২২ রানে। তিনে নামা তাওহিদ হৃদয় আউট হয়েছেন ব্যক্তিগত ১২ রানে, নাজমুল হোসেন শান্ত করেছেন ১৫। মাহিদুল ইসলামের ব্যাট থেকে এসেছে ১৭ রান। অবশ্য ৮৯ বলে ৪৫ রানের ধীরগতির ইনিংসে দলের সর্বোচ্চ এসেছে সৌম্য সরকারের ব্যাট থেকে। ক্যারিবিয়ান স্পিনারদের ঘূর্ণ জাদুতে একটা সময় ২০০ রানের কোটা ছোঁয়াও অসম্ভব মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। ১২৮ রানে পড়েছিল প্রথম ৬ উইকেট।
সেই বিপদ থেকে দলকে উদ্ধার করেন রিশাদ হোসেন। তিন ছক্কা আর তিন চারে ১৪ বলে খেলেছেন ৩৯* রানের ইনিংস। স্পিন কীভাবে হিট করতে হয় সেটা দেখানোর পাশাপাশি দলকেও নিয়ে গেলেন ২০০ রান পেরিয়ে। অবশ্য সব মিলিয়ে ৩০০ বলের মধ্যে ১৯৩টি ডট বল না খেললে সংগ্রহ হয়তো আরো বড় হতে পারত। রিশাদের ঝড়ের ইনিংসে সোহানের ব্যাট থেকে এসেছে ২৪ বলে ২৩ রানের ওয়ানডে সূলভ ইনিংস। অধিনায়ক মিরাজ খেলেছেন ৫৮ বলে ৩২* রানের ইনিংস। তিন উইকেট নেন মোতি, দুটি করে উইকেট পেয়েছেন আকিল ও আথানেজ।


