বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আর নাফ নদীর তীরে টেকনাফ। এই উপকূলীয় শহরেই গত আট বছর ধরে এক দুঃসহ যাতনা, শূন্যতা আর দীর্ঘশ্বাসের ভেতর আটকে আছে আয়েশা বেগম এবং তার দুই মেয়ের জীবন।
২০১৮ সালের মে মাসে এক বিভীষিকাময় রাতে কাউন্সিলর মোহাম্মদ একরামুল হক নিহত হওয়ার পর আয়েশার সাজানো পৃথিবী মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে গেছে। তখন তার দুই মেয়ে কেবল ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। চরম বিপদের দিনে আত্মীয়স্বজনরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে একে একে মুখ ফিরিয়ে নেন। এমনকি একরামুলের ছোট ভাই সাবেক কাউন্সিলর এশামুল হকও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেননি বলে আয়েশার আক্ষেপ।
বিপর্যস্ত এই পরিবারটির ওপর বরং নেমে আসে কঠোর নজরদারি। বাড়ির চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করাও ছিল নিষিদ্ধ। আয়েশা জানান, প্রভাবশালী স্বজনদের কেউ তার এতিম মেয়েদের দিকে ফিরেও তাকাননি। তাদের প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠেছিল স্রেফ টিকে থাকার এক অসম লড়াই। সে সময় অনেক প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী তাকে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে কোনোটিই পূরণ হয়নি। সাদা পোশাকের কিছু লোক সবসময় মোটরসাইকেলে তাদের পিছু নিত। এমনকি সন্তানদের স্কুলে নিতে যাওয়ার সময়ও পিছু ছাড়ত না তারা। আয়েশাকে সরাসরি বলা হতো, যেকোনো সময় তার মৃত্যু হতে পারে। এই ভয় আর অনিশ্চয়তা পরিবারটির মনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে।
আয়েশার অভিযোগের তীরে উঠে এসেছে পৈত্রিক জমি হাতছাড়া হওয়ার বেদনাও। জিয়াউর রহমানের সময়ে রেকর্ডভুক্ত তার বাবার জমিটি দখল করে নেয় স্থানীয় প্রভাবশালীরা, যার মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নাম অন্যতম। নামমাত্র ভাড়ার বিনিময়ে জমির নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া হয় এবং দালালদের মাধ্যমে আয়েশার ভাইবোনদের চাপ দিয়ে সেই জমি কম দামে বেচতে বাধ্য করা হয়।
টেকনাফ পৌরসভার তিনবারের জনপ্রিয় কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা একরামুল হকের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। ২৬ মে ২০১৮, একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধ মেটানোর মিথ্যা ফাঁদে ফেলে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। আয়েশার দাবি, তৎকালীন ডিএফআই কর্মকর্তা নাজমুস সাকিবের নির্দেশেই সেই কলটি করা হয়েছিল। সেই রাতেই মেরিন ড্রাইভ এলাকায় তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিন সকালে জানানো হয়, তিনি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন এবং তার কাছে ইয়াবা ও অস্ত্র পাওয়া গেছে। কিন্তু ময়নাতদন্ত রিপোর্টে আয়েশা তার স্বামীর শরীরে নির্যাতনের বীভৎস দাগ দেখতে পান। ঘটনার সময় একরামুলের কাছে থাকা তিনটি মোবাইল ফোনের মধ্যে দুটি র্যাব নিয়ে যায় এবং সেগুলো আর কখনও ফেরত দেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে সত্য বেরিয়ে আসে অন্যভাবে। মৃত্যুর মুহূর্তে একরামুলের একটি ফোন সচল ছিল, যাতে তার স্ত্রী ও মেয়ের সাথে শেষ কথাগুলো রেকর্ড হয়ে যায়। সেই ১৪ মিনিটের অডিওতে শোনা যাচ্ছিল গুলির শব্দ, একরামুলের যন্ত্রণাকাতর গোঙানি আর ফোনের অন্যপ্রান্তে তার স্ত্রী-সন্তানের বুকফাটা আর্তনাদ। এই অডিও দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দেয়।
র্যাব একরামুলকে ‘ইয়াবা সম্রাট’ বানাতে চাইলেও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিশ্চিত করে যে তার বিরুদ্ধে কোনো মাদক মামলা ছিল না। অডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর র্যাব সদস্যরা কয়েকবার আয়েশার বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি চালায়। আইনের আশ্রয় নিতে চাইলেও প্রভাবশালী আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয়ে আইনজীবীরা সরে দাঁড়াতেন। এমনকি গুম করে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল আয়েশাকে।
এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্যে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক মাত্রা পায়। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আয়েশা প্রথমবার বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছেন এবং প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস পেয়েছেন। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের মামলাটি গ্রহণ করেছে এবং সরকার তাদের ‘শহীদ পরিবার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অভিযুক্ত আবদুর রহমান বদিকে গ্রেপ্তার করা হলেও অনেক সামরিক কর্মকর্তা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বছরের পর বছর ধরে বয়ে চলা এই শোক আর অভাব আয়েশার পরিবারকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। আর্থিক সংকটে মেয়েদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আয়েশা এখন শুধু এটুকুই চান, রাষ্ট্র যেন তার মেয়েদের পাশে দাঁড়ায় এবং তাদের ভিটেমাটির ন্যায্য মূল্যটুকু পাইয়ে দেয়। একসময়ের ব্যক্তিগত এই শোক এখন বাংলাদেশের বিচারহীনতার এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয়েশা বলেন, “আমি শুধু সত্যটা জানতে চাই, আমি ন্যায়বিচার চাই যেন আমার মেয়েরা অন্তত একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ পায়।”


