প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে দেশ জুড়ে লাল-সবুজের সজ্জা দেখা যায়। রাস্তাঘাট-দোকানপাট-যানবাহনে উড়তে থাকে পতাকা, মাইকে বাজতে থাকে দেশাত্মবোধক গান, আর পাড়া-মহল্লায় লেগে থাকে মেলা, কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভিড়। এসবই বিজয়ের মাসকে সাজিয়ে তোলে ভিন্ন রূপে । কিন্তু এই বছর, ঠিক গত বছরের মতোই, সেই চেনা উৎসবের আমেজ চোখে পড়ছে না।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এবারের বিজয় মাসের উদযাপন অনেকটাই নিষ্প্রভ। এবারের বিজয় দিবস আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অনেকে এর কারণ হিসেবে সরকারি উদ্যোগহীনতা ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে দায়ী করছেন।
শহর থেকে গ্রাম একই চিত্র
রাজধানীর শাহবাগে গত দশ বছর ধরে পতাকা বিক্রি করেন মফিজুল ইসলাম। তিনি জানান, ডিসেম্বর মাস এর আগে কখনো এমন নিস্তব্ধ থাকেনি। তিনি ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘আগে ১ ডিসেম্বরের পর ছাত্রদের কাছে পতাকা বিক্রি করতে গিয়ে দম ফেলার ফুরসত পেতাম না। কিন্তু এ বছর বিক্রি নেই বললেই চলে। মানুষের মধ্যে কোনো উৎসবের আমেজ নেই।’
বাড্ডার বাসিন্দা শাহরিয়ার সাকিবের কণ্ঠেও একই সুর। তিনি বলেন, ‘আগে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই এলাকা উৎসবমুখর থাকত। কিন্তু এবছর সব একদম ঠান্ডা। বিশেষ কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। মাসটিকে বিজয় মাস বলেই মনে হচ্ছে না।’
রাজধানীর লালবাগ এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফ হোসেনের কাছে বিজয় মাস মানে ছিল পরিবারের সঙ্গে বাইরে ঘোরা। তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণত বাচ্চাদের নিয়ে বিজয় মেলা বা কনসার্টে যেতাম। এ বছর টিভিতে কোনো খবর নেই, বাইরে পোস্টার নেই। কখনও ভাবিনি বিজয় মাস এমন ম্যাড়ম্যাড়ে হবে।’
ঐতিহ্যের বিপরীতে বিবর্ণ উদযাপন
এই নীরবতা আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগের দু’বছরের চিত্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ২০২২ এবং ২০২৩ সালে, বিজয় মাসজুড়ে ব্যাপক ও দৃশ্যমান সরকারি কর্মসূচি ছিল। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে একযোগে অ্যাক্রোবেটিক শো, যাত্রা পরিবেশন এবং ৬৪টি জেলায় বিজয় সংগীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, যা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও স্বীকৃতি লাভ করেছিল।
অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও বিজয় উদযাপনে ব্যাপকভাবে যুক্ত ছিল। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় মাসব্যাপী প্রযুক্তি অভিযান, যুবক ও মহিলাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনী প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ২০২৩ সালে, জাতীয় পর্যায় ছাড়িয়ে তৃণমূল পর্যন্ত এই কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। স্কুল, কমিউনিটি গ্রুপ এবং স্থানীয় প্রশাসন আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিশুদের প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে দেশজুড়ে এক প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এক মৌলিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমিতে এসেছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের চার মাস পর, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তখন ক্ষমতায়। এই প্রেক্ষাপটে, বিজয় দিবস উদযাপনে ভিন্ন সুর ও কাঠামো দেখা যায়।
তথ্য মন্ত্রণালয় ‘নতুন স্বাধীনতা’ থিমের অধীনে কর্মসূচির আয়োজন করে। এর মধ্যে ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র প্রদর্শন, স্মারক ক্রোড়পত্র ও পুস্তিকা প্রকাশ, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার এবং মন্ত্রণালয় ও এর বিভাগগুলোতে আলোকসজ্জা।
সর্বজনীন ‘বিজয় মেলা’র আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে এর মূল কার্যক্রমের মধ্যে ছিল স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান এবং বিনামূল্যে সিনেমা প্রদর্শন।
অন্যদিকে, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতীকীভাবে মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে একীভূত করার চেষ্টা করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘জেনারেল ওসমানী যাত্রা’, বিপ্লব-ভিত্তিক গ্রাফিতি প্রদর্শনী এবং দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা।
একাধিক মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও, সামগ্রিক কর্মসূচির জনসম্পৃক্ততা সীমিত ছিল। কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে আর্থিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
দিবস উদযাপন নিয়ে বারবার চেষ্টা করেও এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তাফা সরয়ার ফারুকী এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বছরও নিষ্প্রভ আয়োজন
এ বছর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বিজয় দিবস উদযাপন করছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তাদের কর্মসূচিতে আছে ১৬ ডিসেম্বর জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং জেলা পর্যায়ে তিন দিনব্যাপী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিশুদের প্রতিযোগিতা। মাসব্যাপী যাত্রা উৎসব ও দেশব্যাপী বিজয় সঙ্গীত পরিবেশনার আয়োজন করা হলেও এসব কর্মসূচি অতটা দৃশ্যমান নয়।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় কার্যক্রম কিছুটা বাড়লেও আর্থিক ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বড় পরিসরে কেন্দ্রীয় আয়োজন সীমিত করা হয়েছে।’
বিজয়ের মাস উদযাপনে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত বাজেট ছিল ৭ হাজার ১২২ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মামুন রশিদ টাইমসকে জানান, ১৬ ডিসেম্বরের পর আর কোনো চূড়ান্ত কর্মসূচির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। অনুষ্ঠান আয়োজনে সমন্বয় সভা হলেও কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা, বিতর্কিত অর্থ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু অর্থ-সম্পদের সীমাবদ্ধতার জন্য এমন বিবর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা বিজয়ের মাস উদযাপনে রাষ্ট্রীয় উৎসাহকে প্রভাবিত করছে। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন, বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্ম, এনসিপি, জামায়াত এবং বিএনপিসহ সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রত্যেকেই বিজয় দিবসের ইতিহাসকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। ফলে আগের সরকার যেভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বজায় রাখা স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, যেখানে কিছু গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের কিছু দিক অস্বীকার করে, সেখানে অন্যরা এটিকে একচেটিয়াভাবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অর্জন হিসাবে তুলে ধরে। এ অবস্থা অন্তর্বর্তী প্রশাসনের জন্য আগের উদযাপনের মাত্রা ধরে রাখা কঠিন করে তুলেছে।
সাব্বির আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ হলো জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি; জুলাই অভ্যুত্থান গণতন্ত্র ও সমতার নতুন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ১৯৭১ সালের স্থান একক এবং অতুলনীয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফাও বাংলাদেশের জাতীয় চেতনায় ১৯৭১ সালের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্ম একটি একক ও ঐতিহাসিক ঘটনা, যা প্রজন্মের ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় পরিচয়ের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ‘সরকারের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং যে শক্তি তাকে ক্ষমতায় এনেছে, তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও বাজেট বরাদ্দ করা হয়। বিজয়ের মাস বা অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত কীভাবে উদযাপিত হবে, তা নির্ভর করে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান ও দায়িত্ববোধের ওপর।’
মামুন আল মোস্তফা বলেন, আগের সরকারগুলো মুক্তিযুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক মূলকে তুলে ধরে বিজয়ের বয়ান শক্তিশালী করেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অধীনে সেই রাজনৈতিক অবস্থান ও আগ্রহ কতটা সক্রিয়, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
ঐতিহাসিক বিস্মৃতির বিরুদ্ধে সতর্কতা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে ১৯৭১-কে একপাশে সরিয়ে রাখার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৭১-কে উপেক্ষা করা একটি মারাত্মক ভুল হবে। জুলাইয়ের বিপ্লবীরাও মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য স্বীকার করে বলে উল্লেখ করে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
এবারের নিষ্প্রভ পরিবেশের প্রসঙ্গে দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, গত বছরগুলোর মতো এবার উৎসবের কোনো মেজাজ ছিল না। এমনকি শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসও তেমন দৃশ্যমান ছিল না। যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের যদি আমরা ভুলে যাই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তাদের ভুলে যাবে।
তিনি বলেন, ‘তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই স্বাধীনতা ও জাতির ভবিষ্যৎ এসেছে। যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের কীভাবে উপেক্ষা করা যায়? ব্রিটিশ শাসন থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, আমাদের উচিত সবাইকে স্বীকৃতি দেওয়া।’
বাংলাদেশ যখন এক নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে বিজয় মাস উদযাপন করছে, তখন নীরব রাস্তা এবং নিস্প্রভ উদযাপনগুলি ইঙ্গিত দিচ্ছে, জাতি কীভাবে তার অতীতকে স্মরণ করবে।


