রমজান মাস শুরু হতে বাকি আর মাত্র একদিন। এই সময়কে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় আর শ্রমিকদের কর্মতত্পরতায় বাজার মুখর থাকলেও সাধারণ ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও রমজান কেন্দ্রিক পণ্যগুলোর দাম বাড়ায় বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
বর্তমানে চিনির বাজার সবচেয়ে বেশি অস্থির। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে চিনির দাম কেজিতে ৮-১০ টাকা বেড়ে ৯৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা খুচরা বাজারে ১০৫-১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ইফতারের অপরিহার্য উপাদান ছোলার দামও মানভেদে কেজিতে ৪-৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারিতে ছোলা ৮৫ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে এর দাম ঠেকেছে ৯৫-১০০ টাকায়। অথচ তথ্য অনুযায়ী, এবার ছোলার আমদানি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৭ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি হয়েছে। ২০২৪ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ১২৬ মেট্রিক টন ছোলা আমদানি হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫৬ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।
ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নিলেও বাজারে এর তেমন ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। মাসখানেক আগে ১০ কেজির জাহিদি খেজুরের যে প্যাকেট ১ হাজার ৭০০-১ হাজার ৮০০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন ২ হাজার ১৫০-২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ৫ কেজির মরিয়ম খেজুরের দাম ৪ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার টাকা হচ্ছে। আজোয়া ৪ হাজার ২০০ ও ছড়া খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকা।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী ফৌজুল আজিম বলেন, বাজারে বস্তা ও জাহেদি খেজুরের দাম বেশি। বাকি খেজুরগুলোর দাম কম রয়েছে।।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলমের মতে, একটি জাহাজ ডুবে যাওয়া এবং শুল্ক কমার আশায় আমদানিকারকদের দেরিতে আমদানির ফলে বাজারে জাহিদি খেজুরের কিছুটা সংকট রয়েছে।
খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫৫ টাকা, রসুন ১৭০-১৭৫ টাকা, আদা ১০৫ টাকা, আলু ১৫ টাকা, মটরডাল ৫১-৭৬ টাকা, মসুর ডাল ৭৫-৭৬ টাকা, ইন্ডিয়ান এলাচ ৪ হাজার ৬০০, গুয়েতামালা এলাচ ৪ হাজার টাকা, ইন্ডিয়ান জিরা ৬২০ টাকা, ইরানি জিরা ৮০০ টাকা, কিসমিস ৮০০ টাকা, হলুদ ২৫০-২৫৫ টাকা, দেশি মরিচ ২০০-২৩০ টাকা ও ইন্ডিয়ান মরিচ ৩৯০-৪০০ টাকা।
খুচরা বাজারে অন্যান্য পণ্যের দামও বেশ চড়া। বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ ৬০ টাকা, রসুন ১৭০ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকা এবং মানভেদে ডাল ৭০-১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং সরকারি সংস্থা টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু হলে দাম কিছুটা কমতে পারে।
আড়তদারদের দাবি, বাজারে ছোলা, মটর ও খেজুরসহ কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে আমদানিকারকদের পকেটে শুল্ক কমানোর সুবিধা গেলেও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য রমজানের বাজার এখনো স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠেনি।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, বর্তমানে বাজারে ছোলা, মটর ও খেজুরসহ রমজানসংশ্লিষ্ট পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে। বিশেষ করে ছোলার বাজারে আমদানির আধিক্য থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার দাম অনেকটাই কমেছে।
তদারকির অভাব ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য প্রশাসনিক তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, প্রশাসনের যথাযথ মনিটরিং না থাকায় এবং বর্তমান রাজনৈতিক ট্রানজিট পিরিয়ডের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। সাধারণ ক্রেতারা এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত বাজার তদারকি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।


