রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা চলচ্চিত্র: বার বার ফিরতে হয় তার কাছে

রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা চলচ্চিত্র: বার বার ফিরতে হয় তার কাছে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইলাস্ট্রেশন: পূর্ণতা সন্ধি/টাইমস
Advertisement
Advertisement

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—বাংলা সাহিত্যে অবিস্মরণীয় এক নাম। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তার বিচরণ ছিল না। প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদ তার এক বইয়ে মজা করে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ মানুষের অনুভূতির কোনো স্তর নেই যা নিয়ে গান, কবিতা কিংবা গল্প-উপন্যাস লেখেননি। আর তাই তো বাংলা ভাষাভাষী বিখ্যাত অনেক পরিচালকই তাদের নির্মাণে রবীন্দ্রনাথের সহায়তা নিয়েছেন— গল্প, নান্দনিকতা, সংগীত কিংবা জীবন দর্শন।

উপমহাদেশের বিখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায়, ঋতিক ঘটক, তপন সিনহা— তারা রবীন্দ্রনাথকে শুধু সাহিত্যিক হিসেবে দেখেননি, তারা তাকে দেখেছেন এক মানবতাবাদী চিন্তক হিসেবে।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল গভীর ও ব্যক্তিগত। রায়ের পরিবারই ছিল শান্তিনিকেতনের ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অংশ। তিনি নিজেও পড়াশোনা করেছেন বিশ্ব-ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি শুধু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প-সাহিত্যে থেকে নির্যাস নেননি, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য থেকেও নির্মাণ করেছেন একাধিক চলচ্চিত্র— ‘তিনকন্যা’, ‘চারুলতা’ ও ‘ঘরে বাইরে’।

শুধু ‘পথের পাঁচালী’ সত্যজিতের নিখুঁত সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্ররুপান্তর নয়, ‘চারুলতা’-কেও অন্যতম সেরা রুপান্তর ধরা হয়। ‘নষ্টনীড়’ অবলম্বনে অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে এক নিঃসঙ্গ নারীর মানসিক জগৎকে যে সূক্ষ্মতায় দেখানো হয়েছে, তা রবীন্দ্রচিন্তার আধুনিকতাকেই সামনে আনে।

আরেক কিংবদন্তী ঋত্বিক ঘটক নির্মিত চলচ্চিত্রে সরাসরি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের প্রভাব কম হলেও তার চলচ্চিত্রজুড়ে ছড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের বেদনা, দেশভাগের মানবিক ট্র্যাজেডি ও হারিয়ে যাওয়া বাংলার আকুতি। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ কিংবা ‘সুবর্ণরেখা’-তে যে ভেঙে পড়া মানুষের আর্তনাদ দেখা যায়, তা অনেক সমালোচকের মতে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী চেতনারই চলচ্চিত্ররূপ। ঋতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাংলা সংস্কৃতির ভেতরে রবীন্দ্রনাথ এমনভাবে মিশে আছেন যে তাকে আলাদা করা যায় না।

আরও পড়ুন

তপন সিংহকে বলা হয় রবীন্দ্র সাহিত্যের মানবিক রুপের অন্যতম বাহক। তিনি রবীন্দ্রনাথের গল্পের সহজ অথচ গভীর মানবিক দিককে পর্দায় এনেছেন অনেকবার। তার নির্মাণে গ্রামীণ সমাজ, শিশুমন, সামাজিক বৈষম্য—এসব বিষয় রবীন্দ্রভাবনার ধারাবাহিকতাই বহন করেছে।

আধুনিক নির্মাতাদের কাছে আজও রবীন্দ্রনাথ সমান প্রাসঙ্গিক। ঋতুপর্ণ ঘোষ থেকে শুরু করে সমসাময়িক অনেক নির্মাতা তার গল্প, চরিত্র ও সম্পর্কের মনস্তত্ত্বকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সত্যজিতের পরে ঋতুপর্ণও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য থেকে সরাসরি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে— ‘চোখের বালি’, ‘নৌকাডুবি’। তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতে রবীন্দ্রনাথের নারীরা হয়ে ওঠে আরও জটিল, আরও সমকালীন।

রবীন্দ্রনাথের গল্প থেকে নির্মিত আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র— ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘চার অধ্যায়’, ‘মালঞ্চ’, ‘ডিটেকটিভ’, ‘ল্যাবরেটরি’, ‘যোগাযোগ’।

অন্যদিকে বাংলাদেশি নির্মাতারা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য থেকে অনেক নাটক নির্মাণ করলেও চলচ্চিত্র কমই নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখ করা যায় চাষী নজরুল ইসলামের ‘শাস্তি’, ‘সুভা’, কাজী হায়াতের ‘কাবুলিওয়ালা’র কথা। আবার রুবাইয়াত হোসেনের ‘আন্ডারকনস্ট্রাকশন’ সরাসরি রবীন্দ্রনাথের গল্পে না হলেও এতে বিখ্যাত ‘রক্তকরবী’ নাটকের প্রেক্ষাপট এসেছে অনেক বার।

কেন পরিচালকরা বারবার ফিরে যান রবীন্দ্রনাথে? এর উত্তরে বোদ্ধারা বলেন, রবীন্দ্রনাথের গল্পে আছে প্রেম, নিঃসঙ্গতা, নারী স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, শ্রেণিবিভাজন ও আত্মপরিচয়ের সংকট—যা আজও সমান আধুনিক। তার চরিত্রগুলো কখনো পুরানো হয়ে যায় না। এই কারণেই বাংলা সিনেমা যতবার নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চেয়েছে, ততবারই ফিরে গেছে রবীন্দ্রনাথের কাছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad