মেজবাউর রহমান সুমনের রইদ এমন একটি চলচ্চিত্র, যাকে শুধুমাত্র আদম-হাওয়ার রূপক, প্রেমের গল্প কিংবা আর্টহাউজ সিনেমা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এর প্রকৃত শক্তিকে পুরোপুরি ধরা যায় না। ছবিটি একদিকে যেমন পুরাণ, ধর্ম, কামনা, প্রেম ও স্বর্গচ্যুতির গল্প, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদের দুই মানুষের জীবনযাপনের এক গভীর মানবিক দলিল।
ছবিটি দেখার সময় বারবার আমার নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ছিল। সুনামগঞ্জে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলায় আমি এমন অনেক পরিবার দেখেছি, যেখানে হঠাৎ করেই কোনো নারীকে “জ্বিনে ধরেছে”, “বাতাস লেগেছে” কিংবা “পাগল হয়ে গেছে” বলে চিহ্নিত করা হতো। তখন বিষয়গুলোকে পুরোপুরি বুঝতাম না। কিন্তু মনে আছে, সেই বাড়িগুলোকে ঘিরে এক ধরনের জন-উৎসুক পরিবেশ তৈরি হতো। আশপাশের মানুষ ভিড় করত, কেউ পাগলির আচরণ দেখতে আসত, কেউ ঝাড়ফুঁক দেখতে, কেউ বা নিছক কৌতূহলবশত। অনেক সময় ছোট ছোট বাটিতে ফল, পিঠা বা নাস্তা নিয়ে বসে থাকত মানুষ। যেন একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ধীরে ধীরে একটি জনদর্শনে, কখনো কখনো ছোট্ট এক মেলায় রূপ নিত।
এই কারণেই ‘রইদ’ আমার কাছে খুব দুর্বোধ্য বলে মনে হয়নি। কারণ ছবিটির কেন্দ্রে যে নারী চরিত্র, তার মতো মানুষকে আমি বাস্তব জীবনেই দেখেছি। এমনকি একই ধরনের সম্পর্কগত জটিলতাকে কেন্দ্র করে কোভিডকালীন নির্মিত এবং ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত আরেকটি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র An Apple Tree Inside the Head (মাথার ভেতরে একটি আপেল গাছ)-এর কথাও মনে পড়ছিল, যেখানে এক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নারী এবং তার স্বামীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই গল্প এগোয়। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে গেলে, এই ধরনের সম্পর্কের ভেতরে প্রেম, মায়া, ক্লান্তি, দায়িত্ব, কামনা এবং অসহায়ত্ব—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে।
তবে ‘রইদ’-এর শক্তি শুধু এই সম্পর্কের গল্পে নয়। বরং মেজবাউর রহমান সুমন এই পরিচিত বাস্তবতাকে এমন এক সিনেমাটিক জগতে নিয়ে গেছেন, যেখানে বাস্তব ও অবাস্তব, স্মৃতি ও লোকবিশ্বাস, মানবিক অভিজ্ঞতা ও পুরাণ—সবকিছু একসঙ্গে মিশে যায়। ফলে ছবিটি একদিকে যেমন অত্যন্ত পরিচিত মনে হয়, অন্যদিকে তেমনি অধরা।
অনেকেই হয়তো ছবিটিকে অতিরিক্ত রূপকনির্ভর বা কঠিন বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো—আসলেই কি ‘রইদ’ এতটা কঠিন? নাকি আমরা ছবিটির কাছে এমন এক ধরনের ব্যাখ্যা খুঁজতে যাই, যা ছবিটি দিতে চায় না? আমার কাছে মনে হয়েছে, ছবিটির আবেগগত কেন্দ্র আসলে খুবই সহজ। এটি এমন মানুষের গল্প, যারা নিজেদের ভাঙাচোরা বাস্তবতার মধ্যে একটি ছোট্ট আশ্রয় খুঁজতে চেয়েছিল। ছবির রূপক, পুরাণ, জাদুবাস্তবতা কিংবা রহস্যময়তা সেই মানবিক গল্পটিকে ঢেকে দেয় না; বরং আরও গভীর করে তোলে।
এই কারণেই ‘রইদ’কে আমি মূলত একটি সিনেমাটিক অভিজ্ঞতার চলচ্চিত্র বলব।। এটিকে কেবল ব্যাখ্যা করতে বসলে হয়তো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। কিন্তু যদি দর্শক নিজেকে ছবিটির হাতে সমর্পণ করতে পারে, তাহলে এর লোকজ আবহ, জাদুবাস্তবতা (ম্যাজিক রিয়ালিজম), প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনযাপন এবং তাদের অপূর্ণ সম্পর্কের বেদনা মিলিয়ে এক অসাধারণ চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।
ছবির কেন্দ্রে আছে সাধু এবং তার নামহীন স্ত্রী। সবাই তাকে শুধু “পাগলি” বলে ডাকে। তার নিজের কোনো পরিচয় নেই, নিজের নামও যেন সে জানে না। এই নামহীনতা শুধু একটি চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি সমাজের নির্মমতার চিহ্ন। কারণ সমাজ তাকে মানুষ হিসেবে নয়, একটি অবস্থান হিসেবে দেখে। এই নারীটির ভেতরে কোনো না কোনো মানসিক অস্থিরতা আছে—হয়তো ট্রমা, হয়তো কোনো অচিহ্নিত মানসিক রোগ, হয়তো দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সহিংসতার ফল। ছবিটি কখনো তার রোগ নির্ণয় করে না, তার অতীতের ব্যাখ্যাও দেয় না। আমরা শুধু জানতে পারি, তার আগে একটি বিয়ে হয়েছিল। সেই বিয়েতে কী ঘটেছিল, কেন সে আজ এমন, তার জীবনের ভাঙনের উৎস কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর ছবি ইচ্ছাকৃতভাবেই অমীমাংসিত রেখে দেয়। আর এখানেই ‘রইদ’ প্রচলিত কাহিনিচিত্র থেকে আলাদা হয়ে যায়।
অনেক দর্শক ছবিটির রহস্য, অসম্পূর্ণতা এবং উত্তরহীনতাকে দুর্বোধ্যতা হিসেবে পড়তে পারেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, ছবিটির ফর্ম আসলে তার চরিত্রের মানসিক অবস্থারই সম্প্রসারণ। পাগলি যেমন তার জীবনের বিচ্ছিন্ন স্মৃতি, আবেগ এবং অভিজ্ঞতাগুলোকে একটি সুসংহত অর্থে সংগঠিত করতে পারে না, তেমনি দর্শকও ছবির সমস্ত ঘটনা, প্রতীক এবং রহস্যকে একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যায় সাজাতে পারে না। কে তার শেকল খুলে দেয়? আগুন লাগার রাতে তাকে কে বাঁচায়? দূরের গ্রাম থেকে সে কীভাবে বারবার সাধুর কাছে ফিরে আসে? গর্ভের সন্তানের পিতা কে? ছবিটি কোনো উত্তর দেয় না। কিন্তু সেই উত্তরহীনতার মধ্যেই ছবির সত্য লুকিয়ে আছে। কারণ এটি ঘটনা নিয়ে আগ্রহী নয়, অভিজ্ঞতা নিয়ে আগ্রহী।
এই কারণেই ‘রইদ’ আমাকে অনেক বেশি জাদুবাস্তবতার চলচ্চিত্র বলে মনে হয়েছে। বাস্তবতা, লোকবিশ্বাস, স্মৃতি, গুজব, ধর্মীয় অনুভূতি এবং অলৌকিকতার সম্ভাবনা এখানে একই সঙ্গে সহাবস্থান করে। ভাটির জনপদের জীবন এমনই—সেখানে বাস্তবতা কখনো পুরোপুরি যুক্তিবাদী নয়। আর মেজবাউর রহমান সুমন সেই বাস্তবতাকে এমন স্বাভাবিকতার সঙ্গে ধারণ করেছেন যে ছবির বহু রহস্যকে অস্বাভাবিক বলে মনে হয় না।
অনেকে ছবিটিকে আদম-হাওয়ার গল্প হিসেবে পড়েছেন। সেই পাঠ অবশ্যই সম্ভব। সাধু ও পাগলির ছোট্ট ঘরটি যেন এক আদিম ইডেন। সেখানে তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। কোনো বিচার নেই, কোনো নজরদারি নেই, কোনো সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু একসময় বাইরের জগত সেখানে প্রবেশ করে। শিশুরা পাগলিকে উত্যক্ত করে, সালিশ বসে, শেকল পরানো হয়, বিচার হয়। এই মুহূর্তেই তাদের স্বর্গ থেকে পতনের শুরু। তবে ‘রইদ’-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে পতনের জন্য কোনো শয়তান নেই। কোনো একক খলনায়ক নেই। বরং সমাজ নিজেই সেই ভূমিকা পালন করে। তার নিয়ন্ত্রণ, তার বিচার, তার স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা এবং তার ভয়—সব মিলেই স্বর্গচ্যুতির কারণ হয়ে ওঠে।
তবু আমার কাছে ‘রইদ’-এর মূল শক্তি আদম-হাওয়ার রূপকে নয়, বরং সাধু ও পাগলির সম্পর্কের জটিলতায়। কারণ আমি নিশ্চিত নই যে সাধু প্রথম থেকেই প্রেমে পড়েছিল। বরং মনে হয়েছে, সে প্রথমে সংসার চেয়েছিল। একজন স্ত্রী চেয়েছিল। একটি কার্যকর ঘর চেয়েছিল। শরীরের ঘনিষ্ঠতা চেয়েছিল। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল খুব মানবিক, কিন্তু তা সরাসরি প্রেম নয়। সে পাগলিকে কামনা করত, তাকে স্পর্শ করতে চাইত, দাম্পত্যের পূর্ণতা চাইত। অন্যদিকে পাগলির মধ্যে ছিল মায়া, কিন্তু সেই মায়া কখনো প্রচলিত দাম্পত্যে পরিণত হয় না। ফলে সম্পর্কটি এক অদ্ভুত অসমতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে।
এখানে তালের পিঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। অনেকেই এটিকে নিষিদ্ধ গন্ধম ফল হিসেবে পড়েছেন। আমার কাছেও সেই পাঠ যথেষ্ট শক্তিশালী মনে হয়েছে। কিন্তু গন্ধম ফল হিসেবে তালের চেয়েও বড় বিষয় হলো আকাঙ্ক্ষা। একবার সেই আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেওয়ার পর আর ফিরে যাওয়ার পথ থাকে না। সাধুর জীবনে বিপর্যয় শুরু হয় তখনই, যখন সে এই নারীটিকে হারানোর ভয় অনুভব করতে শেখে। অর্থাৎ পতনের শুরু প্রেমে নয়, আকাঙ্ক্ষায়। আর সেই আকাঙ্ক্ষাই ধীরে ধীরে প্রেমে রূপ নেয়।
ছবির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো, সম্পর্কের ভার বহন করে পাগলিই। সাধু তাকে ফেলে আসে। পাগলি ফিরে আসে। আবার দূরে সরে যায়। আবার ফিরে আসে। যেন সে-ই বারবার এই সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের কেউই একে অপরকে পুরোপুরি বুঝতে পারে না। এই অসম্পূর্ণ বোঝাপড়াই ছবির গভীরতম বিষণ্নতা।
মেজবাউর রহমান সুমনের নির্মাণশৈলী এই গল্পকে আরও অনন্য করে তুলেছে। ঋতুর পরিবর্তন, তালের গন্ধ, নীরবতা, আগুন, পশুপাখি—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণ করেছেন, যেখানে বাস্তবতা ও পুরাণ, লোকজ জীবন ও দার্শনিক অনুসন্ধান একাকার হয়ে যায়।
‘রইদ’-এর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এই যে, ছবিটি কখনো তার কারিগরি উৎকর্ষকে প্রদর্শনের বস্তু বানায় না; বরং সমস্ত শিল্পী ও কলাকুশলীর কাজ এমনভাবে আখ্যানের ভেতরে মিশে যায় যে সেগুলো আলাদা করে চোখে পড়ার পরিবর্তে দর্শককে একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতার মধ্যে নিমজ্জিত করে। জোহায়ের মুসাব্বির জ্যোতির চিত্রগ্রহণ এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভাটি অঞ্চলের বিস্তৃত প্রকৃতি, ঋতুর পরিবর্তন, বর্ষার স্যাঁতসেঁতে বিষণ্নতা কিংবা তালগাছঘেরা নিঃসঙ্গ ল্যান্ডস্কেপকে তিনি এমন সংবেদনশীলতায় ধারণ করেছেন যে বাস্তবতা ধীরে ধীরে ম্যাজিক রিয়ালিজমের এক অপার্থিব স্তরে পৌঁছে যায়। এই ছবির ফ্রেমগুলো কেবল সুন্দর নয়; এগুলো চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থারও সম্প্রসারণ। একইভাবে শব্দ বিন্যাস ও আবহসঙ্গীতের সংযত ব্যবহার চলচ্চিত্রটির অন্যতম বড় শক্তি। এখানে নীরবতা, বাতাসের শব্দ, দূরের বৃষ্টি কিংবা তাল ঝরে পড়ার শব্দ অনেক সময় সংলাপের চেয়েও বেশি অর্থ বহন করে। ফলে দর্শক শুধু দৃশ্য দেখে না, বরং ছবিটির ভেতরের আবহ অনুভব করতে শুরু করে।
প্রোডাকশন ডিজাইন ও কস্টিউম ডিজাইনও সমানভাবে প্রশংসার দাবিদার। চরিত্রদের বসবাসের জগৎটি এতটাই জীবন্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য যে মনে হয় এটি কোনো নির্মিত সেট নয়, বরং বহুদিন ধরে ব্যবহৃত একটি বাস্তব জীবনযাপনের অংশ। একই সঙ্গে পোশাক, রঙ এবং পরিবেশের নিরলঙ্কার ব্যবহার চরিত্রগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে না রেখে এক ধরনের কালাতীত মানবিক অবস্থানে নিয়ে যায়। আর এই সমস্ত কারিগরি প্রয়াস শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পেয়েছে নাজিফা তুষি ও মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের অসাধারণ অভিনয়ে। বিশেষ করে তুষি তার চরিত্রকে এমন এক ভঙ্গুরতা, রহস্য এবং শিশুসুলভ অস্থিরতা দিয়েছেন, যা তাকে একই সঙ্গে বাস্তব ও পৌরাণিক করে তোলে। অন্যদিকে ইমরান সাধুর নিঃসঙ্গতা, দেহগত আকাঙ্ক্ষা, হতাশা এবং অপূর্ণ ভালোবাসাকে অত্যন্ত সংযত অথচ গভীরভাবে ধারণ করেছেন। ফলে ‘রইদ’ কেবল একজন নির্মাতার সাফল্য নয়; এটি এমন এক বিরল সম্মিলিত শিল্পসৃষ্টি, যেখানে অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, শব্দ, শিল্প নির্দেশনা এবং লোকজ বাস্তবতা একত্রে মিশে একটি পূর্ণাঙ্গ সিনেমাটিক জগৎ নির্মাণ করেছে।
পাগলি চরিত্রটির দিকে যদি একটু গভীরভাবে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যায় তার ভেতরেও এক ধরনের পরিবর্তনের যাত্রা আছে। ছবির শুরুতে সে প্রায় শিশুসুলভ। সামান্য বিষয়েই আনন্দিত হয়ে ওঠে। কোনো সুন্দর গান শুনলে সবার সঙ্গে নেচে ওঠে, বৃষ্টি দেখলে উচ্ছ্বসিত হয়, চারপাশের পৃথিবীকে যেন এক শিশুর বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করে। অন্যদিকে সাধু অনেক বেশি সামাজিক মানুষ। সে সমাজের একেবারে প্রান্তিক স্তরের হলেও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, লোকলজ্জা কিংবা মানসম্মানের ধারণা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। ফলে যখন আশপাশের মানুষ বলতে শুরু করে যে তার স্ত্রীর মাথায় ছিট আছে, তখন সেও ধীরে ধীরে অন্যদের চোখ দিয়ে নিজের স্ত্রীকে দেখতে শুরু করে। সেই মুহূর্ত থেকেই সে পাগলিকে বোঝার চেয়ে তাকে ঠিক করার চেষ্টা বেশি করে। কীভাবে চলতে হবে, কীভাবে আচরণ করতে হবে, কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়—এসব নির্দেশনা দিতে দিতে সে অজান্তেই তার উপর এক ধরনের সামাজিক কাঠামো চাপিয়ে দিতে শুরু করে।
মজার বিষয় হলো, পাগলি রান্নাবান্না পারে না, সংসারের প্রচলিত কাজকর্মও পারে না, তবু শুরুতে সাধু বিষয়টি বেশ সহানুভূতির সঙ্গেই গ্রহণ করে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই গ্রহণযোগ্যতাই তার কাছে সামাজিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। একসময় সে এমন এক সিদ্ধান্ত নেয়, যা ছবির সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুহূর্তগুলোর একটি। সে পাগলিকে অনেক দূরে ফেলে রেখে চলে আসে। মিয়া সাহেবের সেই সংলাপ—“বউ কি বিড়াল নাকি, যে যেখানে সেখানে ফেলে দিয়ে আসবি?”—হলজুড়ে হাসির সৃষ্টি করলেও, আমার কাছে সেটি ছিল ছবির সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি। কারণ ঠিক তখনই আমরা বুঝতে পারি, সাধু যে মানুষটিকে নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় দেয়, তাকে সে কত সহজে এক অন্ধকার রাতে একা ফেলে রেখে আসতে পারে। একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষকে এভাবে পরিত্যাগ করা আর তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করার মধ্যে আসলে কতটা পার্থক্য আছে—এই প্রশ্নটিও ছবি নিঃশব্দে দর্শকের সামনে ছুড়ে দেয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পাগলি আবার ফিরে আসে। এবং ফিরে আসে কোনো অভিযোগ ছাড়াই। সে বলে, মাথাটা একটু ঠান্ডা করে আসতে সময় লেগেছে। এই সরল স্বীকারোক্তির মধ্যেই যেন চরিত্রটির গভীর মানবিকতা লুকিয়ে আছে। আর ফিরে এসেই সে তালের পিঠা বানাতে শুরু করে। সেই পিঠার স্বাদে মুগ্ধ হয়ে সাধু বারবার বলতে থাকে, জীবনে এমন কিছু সে কখনও খায়নি। এই পর্যায়ে এসে তাদের সম্পর্কের মধ্যে যেন এক ক্ষণস্থায়ী ইডেনের জন্ম হয়। মনে হয়, হয়তো এবার তারা সত্যিই একটি সংসার গড়ে তুলতে পারবে।
কিন্তু সেই স্বর্গও স্থায়ী হয় না। গ্রামের কিছু ছেলের উত্যক্ততা, পাগলির প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তীতে তাকে শিকল পরানোর সিদ্ধান্ত আবারও সেই জগতকে ভেঙে দেয়। শিকলবন্দি অবস্থায় পাগলিকে ঘিরে সাধুর যত্ন, তার তাকে বশে আনার চেষ্টা, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা—সবকিছুই যেন এক ধরনের করুণ ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। তারপর বাড়িতে আগুন লাগে। সাধুর আর কোনো উপায় থাকে না। এবার সে তাকে তার খালার বাড়ির ঘাটে রেখে আসে। কিন্তু এই বিদায় আগের বিদায়ের মতো নয়। এবার পাগলিও যেন বদলে গেছে। সে বুঝতে পারে, তার উপস্থিতি এই সংসারের জন্য এক ধরনের অস্থিরতা হয়ে উঠেছে। ফলে বিদায়ের মুহূর্তে প্রথমবারের মতো তাকে এক ধরনের পরিণত মানুষ বলে মনে হয়। দৃশ্যটি গভীরভাবে হৃদয়বিদারক।
এরপর যখন এক ঝড়ের রাতে সে আবার ফিরে আসে, এবং ফিরে আসে গর্ভবতী অবস্থায়, তখন চরিত্রটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে নিজের অনাগত সন্তানকে নষ্ট করার চেষ্টা, সংসার থেকে চূড়ান্তভাবে সরে যাওয়া কিংবা নীরবতার মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার ভেতরে কী পরিবর্তন ঘটেছে, ছবিটি কখনো সরাসরি বলে না। কিন্তু এখানেই আমার কাছে ছবিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি ধরা দেয়। ধীরে ধীরে মনে হতে থাকে, আমরা আসলে পুরো চলচ্চিত্রটিকেই পাগলির মানসিক জগতের ভেতর দিয়ে দেখছি। যে মানুষটি নিজের ভাঙা স্মৃতি, বিচ্ছিন্ন আবেগ এবং অসম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলোকে এক সুসংহত অর্থে সাজাতে পারে না, তার পৃথিবীও তো এমনই হবে—খণ্ডিত, রহস্যময়, অর্ধেক বলা এবং অর্ধেক অজানা।
সম্ভবত এ কারণেই ‘রইদ’-এর ন্যারেটিভ এতটা ঘোরলাগা। এর অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর নেই, অসংখ্য ঘটনার ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু যদি ছবিটিকে পাগলির মনস্তত্ত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে পড়া যায়, তাহলে এই অস্পষ্টতাগুলো দুর্বলতা বলে মনে হয় না। বরং মনে হয়, দর্শকও কিছু সময়ের জন্য সেই একই মানসিক ঘূর্ণিপাকের মধ্যে প্রবেশ করছে, যার ভেতর দিয়ে পাগলি পৃথিবীকে অনুভব করে। আর ঠিক এই জায়গাতেই ‘রইদ’ তার নিজস্ব চরিত্র খুঁজে পায়—একটি গল্প হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের অনুভূত জগত হিসেবে।
শেষ দৃশ্যে যখন তালের পর তাল ঝরে পড়ছে আর তার মাঝখানে প্রায় সমাধিস্থ সাধুর দিকে পাগলি আবারও একটি তাল বাড়িয়ে দেয়, তখন ছবিটি আর কোনো ব্যাখ্যার জায়গায় থাকে না। সেখানে কেবল অনুভূতি থাকে। তালটি কি আবারও সেই নিষিদ্ধ ফল? নাকি ভালোবাসার শেষ আহ্বান? নাকি গ্রহণ করার শিক্ষা? ছবিটি উত্তর দেয় না। আর সম্ভবত এটাই ‘রইদ’-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
কারণ ছবিটি যত ব্যাখ্যা করতে যাবেন, ততই তা হাত ফসকে যাবে। ঠিক যেমন পাগলির ভাঙা স্মৃতি, বিচ্ছিন্ন আবেগ ও অগোছালো চেতনার ভেতর কোনো একক সত্য খুঁজে পাওয়া যায় না, তেমনি ‘রইদ’-এরও কোনো একক ব্যাখ্যা নেই। এটিকে পুরোপুরি বোঝার চেয়ে অনুভব করাই বেশি জরুরি। আর সেই অনুভবের ভেতরেই ছবিটি ধীরে ধীরে এক বিরল চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়—যেখানে দুই প্রান্তিক মানুষের অসম্পূর্ণ সম্পর্ক, এক নামহীন নারীর নিঃসঙ্গতা, এক পুরুষের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা এবং একটি সমাজের অদৃশ্য নিষ্ঠুরতা মিলেমিশে তৈরি করে শয়তানবিহীন এক আদিম ইডেনের পতনের গল্প।
লেখক: আবু শাহেদ ইমন (চলচ্চিত্র নির্মাতা)


