রংপুর বিভাগের একসময়ের রাজনৈতিক সমীকরণ এখন আমূল বদলে গেছে। গত কয়েক দশকের ‘জাতীয় পার্টির দুর্গ ’হিসেবে পরিচিত এই জনপদে লাঙ্গলের একচ্ছত্র আধিপত্য বিলীন হওয়ার পথে। জাতীয় পার্টি যখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই এই শূন্যস্থানে নিজেদের শক্তির জানান দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।
সুসংগঠিত মাঠপর্যায়ের কাজ ও বাড়তি ভোটব্যাংকের প্রত্যাশা নিয়ে জামায়াত এবার উত্তরের এই জনপদে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে। ফলে আসন্ন নির্বাচনে দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক মেরুকরণ ভেঙে গিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এক নতুন দ্বৈরথের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে রংপুর।
বিভাগের ৩৩টি আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ের মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮টি আসনে বিএনপি এগিয়ে থেকে বড় জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, ১০টি আসনে এগিয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় পার্টি বর্তমানে মাত্র ৩টি আসনে নিজেদের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।
এ ছাড়া দলীয় কোন্দলের কারণে ২টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। এর একটিতে লড়াই হবে বিএনপির দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে, আরেকটিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির প্রার্থী।
আসনভিত্তিক সমীকরণ
পঞ্চগড়-১ (পঞ্চগড় সদর-তেঁতুলিয়া-আটোয়ারী): এই আসনে মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত জোটের এনসিপির মধ্যে। মাঠের জরিপে এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম।
পঞ্চগড়-২ (বোদা-দেবীগঞ্জ): এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। এখানে বিএনপির প্রার্থী ফরহাদ হোসেন আজাদ লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন জামায়াতের প্রার্থী সফিউল আলম।
ঠাকুরগাঁও-১ (সদর): এই আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার সঙ্গে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন।
ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী-রানীশংকৈল আংশিক): এ আসনে এখন পর্যন্ত কিছুটা এগিয়ে আছেন জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল হাকিম। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন বিএনপির আব্দুস সালাম। এই আসনে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রানীশংকৈল আংশিক): এ আসনে লড়াই হচ্ছে ত্রিমুখী। তবে বর্তমান সমীকরণ অনুযায়ী জাতীয় পার্টির হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ লড়াইয়ে কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন জামায়াতের মিজানুর রহমান। তবে বিএনপির প্রার্থী জাহিদুর রহমানও খুব একটা পিছিয়ে নেই।
দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল): এ আসনে বর্তমানে এগিয়ে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মতিউর রহমান। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়াই করছেন বিএনপির মনজুরুল ইসলাম।
দিনাজপুর-২ (বোচাগঞ্জ-বিরল): এ আসনেও জামায়াতের এ কে এম আফজালুল আনাম এগিয়ে আছেন। তার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির মো. সাদিক রিয়াজ। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বেকায়দায় আছেন তিনি।
দিনাজপুর-৩ (সদর): এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার সঙ্গে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন জামায়াতের মাইনুল আলম।
দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর): এ আসনে এগিয়ে আছেন বিএনপির আখতারুজ্জামান মিয়া। তার মূল লড়াই হচ্ছে জামায়াতের প্রার্থী আফতাব উদ্দিন মোল্লার সঙ্গে।
দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ি): এ আসনে একটি ব্যতিক্রমী লড়াই দেখা যাচ্ছে। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী এ জেড এম রেজওয়ানুল হক মূল লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন বিএনপির দলীয় প্রার্থী এ কে এম কামরুজ্জামান। অর্থাৎ এখানে লড়াই হবে বিএনপির নিজস্ব ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে।
দিনাজপুর-৬ (নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর, বিরামপুর, ঘোড়াঘাট): এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন এখন পর্যন্ত কিছুটা এগিয়ে আছেন। তার সাথে মূল লড়াই হচ্ছে জামায়াতের আনোয়ারুল ইসলামের। বড় দুই দলের এই লড়াইয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীও মাঠে রয়েছেন।
নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা): এ আসনে জামায়াতের আব্দুস সাত্তার লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন জাতীয় পার্টির তছলিম উদ্দিন। এখানে বিএনপি জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মঞ্জুরুল ইসলাম সুবিধা করতে পারছেন না।
নীলফামারী-২ (সদর): এ আসনে এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার ভাগ্নে। তার সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আলফারুক আব্দুল লতিফের মূল লড়াই হবে।
নীলফামারী-৩ (জলঢাকা): এ আসনে জামায়াত প্রার্থী ওবায়দুল্লাহ সালাফি লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপির আলহাজ্ব সৈয়দ আলীর।
নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ): এ আসনে এগিয়ে আছেন জাতীয় পার্টির সিদ্দিকুল আলম। তার সঙ্গে ত্রিমুখী লড়াইয়ে আছেন জামায়াতের আব্দুল মুনতাকিম ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রিয়াদ আরফান সরকার রানা। এখানে বিএনপির দলীয় প্রার্থী আব্দুল গফুর সরকার।
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে মূল লড়াই হচ্ছে জামায়াত ও জাতীয় পার্টির মধ্যে। এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন জামায়াতের মাজেদুর রহমান। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোস্তফা মোহসিনের কারণে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বেকায়দায় আছেন।
গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনে জামায়াতের আব্দুল করিম এগিয়ে আছেন। তার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপির প্রার্থী আনিসুজ্জামান খান বাবুর।
গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ী) আসনে এগিয়ে আছেন বিএনপির অধ্যাপক ডাঃ সৈয়দ ময়নুল হাসান সাদিক। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়াই করছেন জামায়াতের মাওলানা আবুল কাওছার নজরুল ইসলাম। এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মইনুর রাব্বী চৌধুরী।
গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ), এখানে বিএনপির মোহাম্মদ শামীম কায়সার লড়াইয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। তার সাথে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন জামায়াতের ডা. আব্দুর রহিম সরকার।
গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল স্পষ্ট। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদ মূল লড়াইয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপির দলীয় প্রার্থী ফারুক আলম সরকারের। এখানে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
কুড়িগ্রাম-১ (নাগেশ্বরী-ভুরুঙ্গামারী) আসনে জাতীয় পার্টির এ কে এম মোস্তাফিজার রহমান এগিয়ে আছেন। তার সঙ্গে জামায়াতের মো. আনোয়ারুল ইসলাম ও বিএনপির সাইফুর রহমান রানার ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে।
কুড়িগ্রাম-২ (সদর-ফুলবাড়ী-রাজারহাট) এই আসনেও বিএনপি, এনসিপি ও জাতীয় পার্টির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে। তবে এখন পর্যন্ত খানিকটা এগিয়ে আছেন বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ। এখানে জামায়াত-জোটের প্রার্থী এনসিপির আতিকুর রহমান মোজাহিদ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী পনির উদ্দিন আহমেদ।
কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে বিএনপির তানভীর উল ইসলাম এগিয়ে আছেন। তার সাথে মূল লড়াই হচ্ছে জামায়াতের ব্যারিস্টার মো. মাহবুবুল আলম সালেহীর।
কুড়িগ্রাম-৪ (চিলমারী-রৌমারী-রাজিবপুর) আসনে এগিয়ে আছেন বিএনপির আজিজুর রহমান এগিয়ে রয়েছেন। তবে এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ে তার প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মোস্তাফিজার রহমান ও জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী রুকনুজ্জামান। এই আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন কেএম ফজলুল মন্ডল।
লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা) আসনে বিএনপির হাসান রাজীব প্রধান এগিয়ে আছেন। তার সাথে মূল লড়াই হচ্ছে জামায়াতের আনোয়ারুল ইসলাম রাজুর। এই আসনে জাতীয় পার্টির হেভিওয়েট প্রার্থী দলের সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা।
লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালীগঞ্জ) আসনে বিএনপির রোকন উদ্দীন বাবলু লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন জামায়াতের প্রার্থী ফিরোজ হায়দার।
লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনে এগিয়ে আছেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু। এখানে তার সাথে জামায়াতের আবু তাহেরের মূল লড়াই হবে।
রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মঞ্জুম আলীর প্রার্থিতা বাতিলের পর জামায়াতের রায়হান সিরাজী এগিয়ে রয়েছেন। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপির মোকাররম হোসেন সুজনের।
রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসনে জামায়াতের এটিএম আজহারুল ইসলাম এগিয়ে আছেন। তার সাথে লড়াই হচ্ছে বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার ও ও জাতীয় পার্টির আনিছুল ইসলাম মন্ডলের।
রংপুর-৩ (সদর) আসনটি রংপুর সদর আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের লড়াইয়ে শীর্ষে রয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন বিএনপির সামসুজ্জামান সামু।
রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে এগিয়ে আছেন বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা। তার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন জামায়াত-জোটের শরীক এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আখতার হোসেন। এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মাহবুবার রহমান।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে জামায়াতের মো. গোলাম রব্বানী এগিয়ে আছেন। তার সঙ্গে জাতীয় পার্টির এস এম ফখর উজ জামান জাহাঙ্গীরের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে এগিয়ে আছেন বিএনপির সাইফুল ইসলাম। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নুরুল আমীন। এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নূর আলম মিয়া।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে এবার মোট ভোটার ১ কোটি ৪০ লাখ ৩৫ হাজার ৮৪৯ জন। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে এই বিশাল জনপদ তাদের যোগ্য প্রতিনিধি বেছে নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।


