জুলাই বিপ্লবের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সহযোগী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাজা বাড়াতে আপিল করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যে অভিযোগে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে, সেই অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করেছে প্রসিকিউশন টিম।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই আপিল করা হয়। আপিলে দুই আসামির সাজা বাড়াতে প্রসিকিউশন আটটি গ্রাউন্ড বা যুক্তি তুলে ধরেছে।
আপিল করার বিষয়টি প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালকে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও প্রমাণিত অন্য অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এটি যথাযথ হয়নি। তাই সাজা বাড়াতে আটটি গ্রাউন্ডে আপিল করা হয়েছে।’
প্রসিকিউশনের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক অভিযোগে হাসিনা ও কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে, নানা কারণে সেটি যথাযথ হয়নি। তাই সাজা বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আপিল আবেদনে প্রসিকিউশন আটটি গ্রাউন্ড বা যুক্তি তুলে ধরেছে।
প্রথম গ্রাউন্ড হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইন ১৯৭৩ এ, শাস্তির কথা বলা আছে; সেখানে প্রথমেই মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। এরপরে গ্রাভিটি অব দ্য অফেন্স বা অপরাধের গুরুত্বের কথা বলা আছে। যেহেতু আইনে একটি শাস্তি উল্লেখ করা আছে, এজন্য আসামিরা ডেথ পেনাল্টি সব চার্জেই পাওয়ার যোগ্য।
দ্বিতীয় যুক্তিতে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেটা হলো মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন। এবং সেখানে হেনিয়াস অফেন্স হয়েছে, যার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, বিপ্লব চলাকালে নিরীহ, নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপরে যে আক্রমণ বা আঘাত সংঘটিত হয়েছে, তার ব্যাপকতা ছিল মারাত্মক। এ কারণে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি আইনত সঠিক হয়নি।
অন্যদিকে, চতুর্থ যুক্তি হলো ‘গ্রাভিটি অব দ্য অফেন্স’ অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত।
পঞ্চমত, শুধু আসামির অধিকার দেখলেই চলবে না, ভিকটিমের অধিকার ও সমাজের যৌক্তিক প্রত্যাশাও বিবেচনায় নিতে হবে। এ ধরনের অপরাধে সমাজ কী ধরনের শাস্তি প্রত্যাশা করে, ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ প্রবণতা বন্ধ করার জন্য আদালত কর্তৃক কি ধরনের শাস্তি প্রদত্ত হলে; সমাজ এই ধরনের অপরাধ থেকে মুক্ত হবে, সেটিও আদালতের দেখা উচিত ছিল। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড তাই প্রদান করা উচিত ছিল।
ষষ্ঠ গ্রাউন্ডে বলা হয়, এই আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পলাতক। তারা জানেন, তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইবুনালে মামলা চলছে, সাজা হচ্ছে, আপিলের মেয়াদ ৩০ দিন। এগুলো জেনেই তারা নিজেদের পলাতক রেখেছেন এবং পলাতক থেকে বিভিন্নভাবে বিচারে বাধা দিচ্ছেন। এ জন্য বিভিন্ন বক্তব্য, বিবৃতি প্রদান করছেন। এ অবস্থায় তাদের শাস্তি কমানোর সুযোগ নেই।
সপ্তম যুক্তি, আসামিদের সরাসরি আদেশ বা নির্দেশে যে ধরনের হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তা পৈশাচিক। তাদের নির্দেশে সারাদেশে ১৪শর বেশি মানুষ শহীদ ও ২৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।
সর্বশেষ যুক্তি হলো, প্রথম অভিযোগে আবু সাঈদের হত্যার কথা ছিল, যিনি এই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পাইনিয়ার। অতএব এই অভিযোগে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডই ছিল ন্যায়বিচার। সেটি যেহেতু ট্রাইবুনাল দেয়নি, তাই এখানেও মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত।
মানবতাবিরোধী অপরাধে ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ হাসিনাসহ তিন আসামির মামলার রায় দেয়। রায়ে হাসিনা ও কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে রাজসাক্ষী হয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তথ্য দিয়ে আদালতকে সহযোগিতা করায় তাদের সহযোগী তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ে আদালত বলেছে, হাসিনা, কামাল ও মামুনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা পাঁচটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। তবে, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগকে আদালত একসঙ্গে গ্রহণ করেছে। এই অভিযোগে হাসিনা ও কামালের আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে। চতুর্থ ও পঞ্চম অভিযোগকে একীভূত করে এই অভিযোগে হাসিনা ও কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, আপিল দায়ের হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। গণআন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই পলাতক রয়েছেন হাসিনা ও কামাল। তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার হয়।


