সত্যজিৎ রায়ের অনন্য সৃষ্টি ‘অশনি সংকেত’। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ থেকে সিনেমা বানিয়ে তখন সত্যজিৎ তারকা নির্মাতা। তখনই তিনি লেখকের ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাসটি পড়েন। সেটি থেকে প্রথমে চিত্রনাট্য করেন তিনি। ১৯৭২ সালের দিকে সিনেমাটি নির্মাণের কাজে হাত দেন। তার সঙ্গে তখন সৌমিত্র চট্টোপধ্যায় আছে গঙ্গাচরণ চক্রবর্তী চরিত্রের জন্য। কিন্তু অনঙ্গ বউ চরিত্রের জন্য তার দরকার ছিল সহজ-সরল কিন্তু লাস্যময়ী গ্রামীণ রমণী।
বহু জনকেই খুঁজলেন সত্যজিৎ। কিন্তু তার পছন্দ হয় না কাউকেই। শেষে বিখ্যাত আলোকচিত্রী নিমাই ঘোষের তোলা সাদাকালো এক ছবি দেখে তিনি বলে উঠেছিলেন, ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’। আর এ ছবিটি ছিল বাংলাদেশের প্রখ্যাত নায়িকা ববিতার।
কীভাবে সত্যজিৎ তার খোঁজ পেয়েছিলেন, ববিতা এ গল্প বহু জায়গায় বলেছেন। সাজ্জাদ হুসাইনের লেখা ‘বিস্ময়ে ববিতা’ বইয়ে ববিতা জানিয়েছেন সে গল্প।
একদিন এফডিসি কোনো এক ছবির শুটিং করছিলেন ববিতা। তখন নিমাই ঘোষ একটু পর পর তার ছবি তুলছিলেন। ইউনিটের লোকদের কাছ থেকে জানতে পারলেন তিনি ভারতীয় একজন ফটোগ্রাফার। ব্যস! এতটুকুই। তিনি মনযোগ দিয়ে শুটিং করলেন।
এখানে একটু বলে নেই, লেখক সাজ্জাদ হুসাইন জানাচ্ছেন ববিতার ওইদিনের ছবিগুলো থেকে সত্যজিৎ তাকে নির্বাচন করেননি। তিনি বইটিতে লিখেছেন, নিমাই ঘোষ রাজ্জাকের বাড়িতে ববিতাকে দেখেছিলেন। সেখানে একটি ছবির শুটিংয়ে তিনি তার কয়েকটি মেকআপ ছাড়া ছবি তুলেছিলেন। ওই ছবিগুলোই দারুণ পছন্দ হয়ে যায় সত্যজিতের।
যাই হোক, কদিন পরে তার গেণ্ডারিয়ার বাসার ঠিকানায় ‘অশনি সংকেত’-এর প্রযোজক চিঠি পাঠালেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘তুমি একবার ইন্ডিয়ায় আসতে পারবে? সত্যজিৎ রায় তোমাকে দেখতে চেয়েছেন- উনার ছবিতে অভিনয়ের জন্য’। ভাবলেন কেউ বুঝি দুষ্টামি করছে। কিন্তু এটি যে দুষ্টামি নয় বুঝলেন যখন কদিন পরে বাসার ল্যান্ডফোনটি বেজে উঠলো। ফোনটি ধরেছিল, তার বোন আরেক বিখ্যাত নায়িকা সুচন্দা। অপর পাশের কণ্ঠটি বললো, ভারতীয় হাইকমিশন থেকে। তারা কি সত্যজিতের চিঠিটি সিরিয়াসলি নেয়নি?
দ্রুত ভারতে গেলেন। ‘অশনি সংকেত’-এর প্রযোজকই সব ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রথম দিন কড়া মেকআপ করে তার বাসায় গেলেন। কিন্তু সত্যজিৎ তাকে নির্দেশ দেন পরদিন কোনো মেকআপ ছাড়া কেবল সিঁথিতে সিঁদুর, একটি টিপ এবং হাতে শাঁখা পরে ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে আসতে।
আর পরদিন কী হলো? ইতিহাসের জন্ম। সত্যজিৎ তার কাঙ্খিত নায়িকাকে পেয়ে গেলেন। আর সিনেমাটি ১৯৭৩ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জিতলো ‘গোল্ডেন বিয়ার’।


