বাতাসে কান পাতলেই এখন ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ, শহরে লেগেছে রঙের ছোঁয়া, ধুপ আর গাঁদা ফুলের সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে। ঢাকা, কলকাতাসহ উপমহাদেশের শহরগুলো এখন ঝলমল করছে দুর্গা পূজা উপলক্ষে সাজানো বাড়ি আর প্যান্ডেলে।
এসবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন দেবী দুর্গা। দশটি হাত ১০ দিকে প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। প্রতিটি হাতে একটি করে অস্ত্র। যে ভঙ্গিতে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন তা শক্তি, সুরক্ষা এবং ভারসাম্যের বার্তা বহন করে। দেবী তার সিংহে আরোহন করে তীব্র তেজে তাকিয়ে থাকেন মহিষাসুরের দিকে।
তবে, তার গল্প কেবল মাটির প্রতিমা বা মন্দিরের আরতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের চারপাশে দেখা অসংখ্য আধুনিক নারীর মধ্যেও থাকেন দেবী দুর্গা। এমনভাবে তিনি প্রতিটি নারীর জীবনে জড়িয়ে থাকেন, যেটিতে অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে বাঙালী সংস্কৃতিতে দুর্গা সবসময়ই কেবল আরাধ্য দেবীর চাইতে বেশি কিছু। দুর্গা হলেন শক্তি আর সাহসের প্রতীক। একইসঙ্গে সৃজনশীলতা, যত্ন, বিদ্রোহ এবং টিকে থাকারও প্রতীক।
আর এখন আমরা এমন সময়ে বাস করি যেখানে দুর্গার এই সব রূপ দেখতে পাই আমাদের চারপাশের অসংখ্য নারীর মধ্যে।
পেশাজীবনে দুর্গা
করপোরেট অফিসের বোর্ডরুম, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েল ক্লাসরুম, স্টুডিও কিংবা স্টার্টআপ, সব জায়গাতেই নারীরা নিজের যোগ্যতা দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। এখানে তাদের অস্ত্র জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্ব। দুর্গার দশটি হাত যেমন একসঙ্গে কাজ করে, তেমনি আধুনিক পেশাজীবীরা কাজের ডেডলাইন, প্রকল্প এবং আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করেন। কোনো বাধাই তাদের চলার পথকে থামিয়ে দিতে পারে না।
চিন্তু করুন একটি একটি পুরুষপ্রধান ল্যাবের কথা যেখানে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন নারী বিজ্ঞানী। একজন উদ্যোক্তা যিনি পূর্ণ বিশ্বাসেরর সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরছেন নিজের প্রস্তাব অথবা একজন ব্যবস্থাপক যিনি কঠিন করপোরেট জগতেও সমানুভূতির সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই নারীদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি অগ্রগতি, প্রতিটি সীমানা লঙ্ঘনে থাকে দুর্গার গর্জন। আমাদের আধুনিক যুগের দুর্গারা হয়থ রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন না। কিন্তু প্রতিদিন যে অধ্যবসায়, সাহস এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তারা কাজ করেন, তা কোনোভাবেই কম বীরত্বের নয়।
যত্নে দুর্গা
দুর্গা কেবল একজন যোদ্ধা নযন। তিনি একজন মা, একজন পালনকারী এবং একজন পথপ্রদর্শকও। আধুনিক পৃথিবীতে, দুর্গার এই রূপটি সবখানে বিদ্যমান। মা তার সন্তানের ভবিষ্যত গড়ে তুলছেন, শিক্ষক কৌতুহলের বীজ রোপণ করছেন শিক্ষার্থীদের জীবনে, নার্স অসুস্থদের সেরা করে যাচ্ছে অবিরাম।
এই নারীদের শক্তি হলো তাদের ধৈর্য এবং সহানুভূতি। তারা শারীরিক, মানসিক, এমনকি আত্মিক আঘাতেও প্রলেপ দেন। এই শক্তি গর্জন করে না, কিন্তু ধীরে ধীরে দীপ্তি ছড়ায়। তাদের ভালোবাসা পরিবার, গোষ্ঠী এবং পুরো সমাজকে একত্রিত করে রাখে। যা মনে করিয়ে দেয়, দয়া বা মায়া দুর্বলতা নয়; এটি দুর্গার সবচেয়ে বড় শক্তির মধ্যে একটি।
বিদ্রোহী দুর্গা
যখন দুর্গা মহিষাসুরকে হত্যা করেন, তিনি কেবল একটি রাক্ষসের মুখোমুখি হন না, তিনি অবাধ ক্ষমতা ও ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করেন। একইভাবে আজ বিশ্বের নারীরাও পোষণ করেন একই দুর্বিনীত মনোভাব। তারা পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে, হয়রানির বিরুদ্ধে কথা বলে এবং একসময়ের চাপিয়ে দেওয়া নীরবতা ভেঙে সমতার দাবি তোলেন।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করে পথে নামা নারী থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা নারী, এরা প্রত্যেকেই দুর্গার উত্থিত ত্রিশূলের প্রতিধ্বনি। কখনো বিদ্রোহ জোরালো হয় প্ল্যাকার্ড, মিছিল এবং প্রতিবাদী স্লোগানে। আবার কখনো নীরবে পরিবারের বিরোধিতার পরেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা অথবা কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি দাবি করা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেকোনো ‘না’-ই দুর্গার আগুনের জ্বলন্ত প্রকাশ।
বেঁচে থাকার প্রতীক দুর্গা
সব যুদ্ধ খোলা ময়দানে হয় না। কিছু যুদ্ধ হয় রান্নাঘরে বা শোবার ঘরে। আবার কিছু যুদ্ধ হয় মনের গোপন ঘরে। অনেক নারী নির্যাতন, আঘাত এবং সমাজিক চাপের মধ্যে নিঃশব্দে জীবনযাপন করেন। নানা চাপের পরেও একসময় তারা উঠে দাঁড়ান।
যে নারী পারিবারিক নির্যাতন থেকে বেরিয়ে নতুন করে জীবন গোছান, যে মেয়েটি বছরের পর বছর অবদমিত থাকার পর একদিন নিজের জন্য আওয়াজ তোলে কিংবা যে নারী স্বামীর মৃত্যুতে শেষ না হয়ে নিজের বা সন্তানের জীবনে হাসি ফিরিয়ে আনেন, তারা সবাই দুর্গার সহনশীলতার প্রতিমূর্তি।
সৃষ্টির আধার দুর্গা
দুর্গা কেবল মন্দিরের দেবী নন, তিনি সৃষ্টির শক্তিও। এই শক্তি নারীদের মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন প্রবাহিত হয়। নারী শিল্পী, লেখক, ডিজাইনার এবং উদ্ভাবকরা রোজ নতুন নতুন ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজকে প্রেরণা দেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন এবং পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেন।
দুর্গা যেভাবে ভবিষ্যৎ গড়েন তেমনি এই নারীরাও সংস্কৃতিকে আকার দেন। যা প্রমাণ করে, নারীর শক্তি কেবল নির্মাণে নয়, যুদ্ধে বা সুরক্ষায়ও সমানভাবে কাজ করে। শিল্পীর তুলি প্রতিটি আঁচড়ে, প্রতিটি উপন্যাসে, প্রতিটি উদ্ভাবনে দুর্গার সৃজনশীলতার প্রমাণ মেলে।
প্রতিদিনের নারী হিসেবে দুর্গা
দুর্গার সম্ভবত সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর রূপ হলো প্রতিদিনের নারীর মধ্যে। হোমমেকার নারী যারা পরিবারের বাজেট সামলান, রাস্তায় জিনিসপত্র ফেরি করে বেড়ানো নারী যারা পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করেন, যে শিক্ষার্থীরা রাত জেগে লেখাপড়া করে, যে নার্স রাতের পালায় কাজ করেন যখন তার পুরো পরিবার ঘুমায়; এই সবার মধ্যে দুর্গা বিদ্যমান।
তাদের এই জীবনসংগ্রাম পত্রিকার শিরোনাম হয় না, কিন্তু এগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা প্রতিদিন মহিষাসুরের মতো দারিদ্র্য আর পক্ষপাতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। সংগ্রাম করেন নিজের প্রত্যাশা পূরণের জন্যও। তারা পরিবারকে একত্রিত রাখেন, সব প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে শিক্ষার পথে এগিয়ে যান এবং সমাজের সৃষ্টি করা সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নিজেদের জন্য স্থান তৈরি করেন, পথ দেখান। তাদের পথচলা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ, কিন্তু আদতে তা অসাধারণ।
তাদের দৃঢ়তায়, হাসিতে, নীরব ত্যাগে দেবী রূপটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। তারা প্রমাণ করেন যে দেবত্ব বিরল নয়। প্রতিদিনের সহনশীলতা, ভালোবাসা এবং সাহসে বেঁচে থাকেন দেবী দুর্গা।
দুর্গা পূজার আয়োজন বেশ কয়েকদিনের। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দেবী মর্ত্য ছেড়ে গেলেই সাঙ্গ হবে সব আয়োজন। নিভে যাবে প্যান্ডেলে আলো, থেমে যাবে ঢাকের আওয়াজ।
প্রতিমার বিসর্জন হবে কিন্তু নানা রূপে দুর্গা থেকে যাবেন পৃথিবীতে। আমাদের চারপাশে মা, বোন, কন্যা, সহকর্মী এবং বন্ধুদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন তিনি। প্রতিটি নারী যারা সাহসী, যারা সাধারণ, সারা বিদ্রোহী, যারা সৃষ্টিশীল; সবার মধ্যেই বেঁচে থাকবেন দুর্গা।
তাই আসুন, এবারের পূজায় আমরা সমস্ত চাকচিক্য আর আচার-অনুষ্ঠানের পেছনে তাকিয়ে দেবীকে দেখি অন্য রূপে। যেই রূপে তিনি চারপাশের সব নারীর মধ্যে বিরাজমান। সেই নারীকে দেখি যিনি প্রতিটি চ্যালেঞ্জে, প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি সাহসী কাজের মধ্যে দুর্গা হয়ে বেঁচে থাকেন। কারণ আমরা জানি, প্রতিটি আধুনিক নারীর মধ্যে দুর্গা আছেন।


