হাওরবেষ্টিত মৌলভীবাজার জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম হাকালুকি হাওরসহ জেলার ছোট-বড় আটটি হাওর এলাকায় বর্তমানে বোরো ধানের আবাদ চললেও পর্যাপ্ত সেচের অভাবে কৃষকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেক স্থানে চারা রোপণের পর জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও পানির অভাবে চাষিরা এখনো চারা রোপণই করতে পারেননি। ফলে জেলাজুড়ে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে মৌলভীবাজারে মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় প্রায় ২৭ হাজার ৩৪৫ হেক্টর এবং অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় ৩৫ হাজার ৫৫ হেক্টর জমি রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবাদি জমির একটি বড় অংশেই এখন তীব্র সেচ সংকট বিরাজ করছে।
সরেজমিনে জেলার সাতটি উপজেলার হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, কেওলার ও হাইল হাওরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হাওরের নিচু ও উঁচু উভয় অঞ্চলেই পানির হাহাকার চলছে। সেচ নালাগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কুলাউড়া উপজেলার কৃষক সালমান মিয়া, কমলগঞ্জের মর্তুজ আলী এবং রাজনগর উপজেলার কৃষক রিপন তাদের দুর্দশার কথা জানিয়ে বলেন, বোরো চাষের শুরুতে কিছু পানি পাওয়া গেলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎসগুলো শুকিয়ে যায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করে জমি বাঁচানোর চেষ্টা করতে হয়, যা চাষের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এতে লাভের চেয়ে লোকসানের আশঙ্কাই বেশি থাকে।
সাধারণ কৃষকদের মতে, হাওর এলাকার বিভিন্ন ছড়া, খাল ও বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত ক্রসবাঁধ নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত গভীর নলকূপ না থাকায় সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রতি একর জমিতে বোরো চাষে বর্তমানে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে, কিন্তু পানির অভাবে সেই বিনিয়োগ এখন ঝুঁকির মুখে।
কৃষকদের দাবি, হাওর অঞ্চলে সেচের স্থায়ী সমাধান না হলে বোরো চাষে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন সংকটের কথা স্বীকার করে জানান যে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানির সমস্যা প্রকট। অনেক ছড়া ও নালা দিয়ে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহিত না হওয়ায় এবং নলকূপের স্বল্পতার কারণে কৃষকেরা সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি জানান, প্রয়োজনীয় সেচ অবকাঠামো নির্মাণ ও নালা খনন করা গেলে জেলায় বোরো আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে জেলার সাতটি উপজেলায় ১৪টি সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা সচল রয়েছে উল্লেখ করে কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এই ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানো গেলে আরও অন্তত ৩০ হাজার হেক্টর জমি বোরো চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, যেসব এলাকায় কার্যকর সেচ নালা রয়েছে সেখানে কৃষকেরা কমবেশি পানি পাচ্ছেন। তবে যেখানে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তা নিরসনে বিভাগীয়ভাবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
কৃষকদের টিকে থাকার লড়াই সহজ করতে দ্রুত সেচ সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলার ভুক্তভোগী কৃষিজীবীরা।


