উৎপাদন খরচের তুলনায় দ্বিগুণ লাভ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কম হওয়ায় কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ভুট্টা চাষ। বোরো ধানের বিকল্প ফসল হিসেবে এখন চরাঞ্চল ও পলি পড়া পতিত জমিতে এই দানাদার শস্যের আবাদ বাড়িয়ে চলেছেন স্থানীয় কৃষকরা। স্বল্প সময়ে ফসল ঘরে তোলা যায় বলে আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি সমানভাবে এটি পশুখাদ্য ও জ্বালানির চাহিদাও মেটাচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরেই কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভুট্টা চাষে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর প্রায় এক হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে ভুট্টার আবাদ বেড়েছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, প্রতি হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষে খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে আয় হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। বর্ষা আসার আগেই এই ফসল ঘরে তোলা যায় বলে আগাম বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
হাওর এলাকার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ভুট্টা চাষিদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাতায়াত ও পরিবহন খরচ কম হওয়ায় ক্রেতারা সরাসরি মাঠ থেকেই ভুট্টা সংগ্রহ করেন। এর ফলে কৃষকরাও ফসলের নায্য দাম পাচ্ছেন।
এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলে যখন পশুখাদ্য ও জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দেয়, তখন শুকনা ভুট্টা গাছ ও অবশিষ্টাংশ সেই চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী গ্রামের কৃষক মিনহাজ উদ্দিনের মতে, ভুট্টা চাষে ধানের চেয়ে দ্রুত ফলন পাওয়া যায়। এতে হাওরে হানা দেওয়া আগাম বন্যার ঝুঁকি থেকে তারা অনেকটা নিরাপদ থাকেন। ধানের চেয়ে ফলন ও লাভ দুটোই বেশি হওয়ায় তারা এখন ভুট্টা চাষকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
একই গ্রামের আরেক কৃষক হাফিজুর রহমান এ বছর দুই একর জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। তিনি জানান, মাত্র একবার সেচ দিয়েই তার জমিতে আশাতীত ফলন হয়েছে। যে সব জমিতে ধানের ফলন তেমন আশাব্যঞ্জক নয়, সেসব জমিতেও এখন ভুট্টার বাম্পার ফলন হচ্ছে। লাভের মুখ দেখে আগামীতে চাষের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন তিনি।
এদিকে শুধু হাওরাঞ্চল নয়, জেলার প্রতিটি চর ও পতিত জমিতেও ভুট্টা চাষ ছড়িয়ে দিতে সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, ‘জেলায় এ বছর মোট ১১ হাজার ৮ শত ৫৩ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। যদিও তার দেওয়া তথ্যমতে আবাদের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম, তবুও ভালো ফলন ও বাড়তি মুনাফার কারণে কৃষকদের মধ্যে এই চাষের প্রতি আগ্রহ উত্তরোত্তর বাড়ছে।’
কৃষি কর্মকর্তাদের ধারণা, সঠিক তদারকি ও অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে ভবিষ্যতে জেলায় ভুট্টা চাষে নতুন বিপ্লব ঘটবে।


