কীভাবে এক মস্তিষ্ক ২ ভাষায় কথা বলে?

কীভাবে এক মস্তিষ্ক ২ ভাষায় কথা বলে?
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

মাতৃভাষা সারাজীবন বললে তার ব্যাকরণ মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। এ কারণে ‘অ্যাবস্কোয়াটুলেট’ শব্দটির অর্থ না জানলেও, এর বর্তমান রূপ যে ‘অ্যাবস্কোয়াটুলেটিং’ হবে তা আপনি সহজেই অনুমান করতে পারেন। তবে সব ভাষার ব্যাকরণ এক নয়। তাই নিউরোবিজ্ঞানীরা আগে ভাবতেন, দ্বিভাষী মানুষেরা একেক ভাষার জন্য মস্তিষ্কের একেক অংশ বা ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন।

নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতিতে ধারণার চেয়েও বেশি মিল রয়েছে। একবচন বা বহুবচন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দ্বিভাষী মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপে দারুণ মিল দেখা যায়। তারা প্রথম বা দ্বিতীয় যে ভাষাতেই কথা বলুন না কেন, মস্তিষ্কের সক্রিয়তা একই রকম থাকে।

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী এস্তি ব্লাঙ্কো-এলরিয়েতা এই গবেষণার অন্যতম লেখক। এটি ‘জে-নিউরোসায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পদ্ধতিটি যে এতটা এক হবে, তা স্পষ্ট ছিল না। দুটি ভাষা মস্তিষ্কে কত গভীরভাবে মিশে থাকে, এটি তার প্রথম সূক্ষ্ম প্রমাণ।’

আগের গবেষণায় দ্বিভাষী হওয়াকে মাতৃভাষা চর্চার ক্ষেত্রে একটি বাড়তি চাপ বা বাধা হিসেবে দেখা হতো। এই মন্তব্য করেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জুডিথ ক্রোল। তিনি বর্তমান গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না।

পরের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিভাষী মানুষের মস্তিষ্কের গঠনে কিছু ইতিবাচক পার্থক্য থাকে। এদের স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বেশি হয়।

বিজ্ঞানীরা এখন জানার চেষ্টা করছেন, একাধিক ভাষা সামলাতে মস্তিষ্কের মূল নেটওয়ার্ক একসঙ্গে কয়েক গুণ বেশি কাজ করে কি না।

আরও পড়ুন

বিষয়টি বুঝতে ড. ব্লাঙ্কো-এলরিয়েতার দল ২৩ জন স্প্যানিশ ও ইংরেজিভাষী মানুষকে এমইজি স্ক্যানারে রাখেন। এরপর একবচন ও বহুবচন করার সময় তাদের মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণ করা হয়।

স্ক্যানারে থাকা অবস্থায় তাদের কিছু শব্দ দেখানো হয়, যেমন—‘বোটস’ বা ‘টুনা’। এরপর নির্দেশ দেওয়া হয়। শব্দটিকে একবচন করতে বলা হয় ‘ওয়ান’ বা ‘উনো’। বহুবচন করতে বলা হয় ‘টু’ বা ‘দোস’। কোনো বদল ছাড়া শুধু শব্দটি মুখে বলতে বলা হয় ‘সে’ বা ‘দি’। এই হিসাব-নিকাশের আগে ও পরে প্রতি মিলি-সেকেন্ডের মস্তিষ্কের ছবি নেয় স্ক্যানার।

গবেষকরা দেখেন, স্প্যানিশ বা ইংরেজি যে শব্দই হোক না কেন, মস্তিষ্কের কর্মপদ্ধতি প্রায় একই রকম ছিল। দুই ভাষার মধ্যে কোনো মিল বা সমার্থ না থাকলেও ফলের বদল হয়নি। যেমন—‘ট্যাক্সি’ শব্দটি দুই ভাষাতেই একই। এমনকি কোনো অর্থ নেই কিন্তু শুনতে স্প্যানিশ বা ইংরেজির মতো শোনায়, এমন ছদ্ম-শব্দের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম মিলছে।

ড. ব্লাঙ্কো-এলরিয়েতা বলেন, ‘শুধু শব্দভাণ্ডারের মিলের কারণে এমনটি ঘটছে না। এটি ইঙ্গিত করে, মস্তিষ্ক মূলত ব্যাকরণের নিয়মটিকেই ফুটিয়ে তুলছে।’

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী মিরজানা বোজিক বলেন, এই ফল আগের কিছু ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। তিনি এই গবেষণায় ছিলেন না। নতুন গবেষণাটি প্রমাণ করেছে যে, ভিন্ন ভাষার ব্যাকরণ সামলাতে মস্তিষ্কের সামনের বাঁ দিকের অংশ কাজ করে। ড. ব্লাঙ্কো-এলরিয়েতা জানান, মস্তিষ্কের একটি একক ‘ব্যাকরণ ইঞ্জিন’ একসঙ্গে একাধিক ভাষার শক্তি জোগাতে পারে।

ড. বোজিক বলেন, এই আবিষ্কার অত্যন্ত তথ্যবহুল। এটি দ্বিভাষী মানুষের একই নিউরাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করার একটি চমৎকার প্রমাণ। তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার ভাষার ক্ষেত্রে এই ফলাফল কতটা মিলবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

ড. ব্লাঙ্কো-এলরিয়েতার দল এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষার ওপর এই পরীক্ষাটি করতে চায়। তারা বাক্যের গঠন ও শব্দের ব্যবহার নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা করবে।

ড. ক্রোল বলেন, ‘মস্তিষ্ক আমাদের আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি নমনীয়। এখানে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad