জুলাই স্মৃতি জাদুঘর: ফারুকীর ‘অনিয়মের জাদু’

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর: ফারুকীর ‘অনিয়মের জাদু’
কার্টুন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তস্নাত ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য গড়া হচ্ছিল ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। কিন্তু সেই স্মৃতির আড়ালে সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার আর স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী পদমর্যাদায় থেকে তিনি এমন এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেখানে তিনি নিজেই নিজের নিয়োগকর্তা এবং নিজেই নিজের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতাও শিথিল করেছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর এক অনুসন্ধানে সরকারি নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও দলিল সংরক্ষণের লক্ষ্যে এই জাদুঘরটি প্রথমে জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা হিসেবে তৈরির পরিকল্পনা ছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, ফারুকীর প্রভাবে পরবর্তীতে এটিকে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ৯৬ কোটি টাকা বাজেটের এই স্বতন্ত্র প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।

অধ্যাদেশের ৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, শিক্ষা, ইতিহাস বা সংস্কৃতি জগতের একজন ‘বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ’ এই জাদুঘরের বোর্ডের নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে ৩ ফেব্রুয়ারি এক গেজেটের মাধ্যমে ফারুকী নিজেই সেই পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এই পদক্ষেপকে নৈতিক স্খলন ও স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, কেউ যদি মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তবে একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ নেওয়া স্পষ্টতই স্বার্থের সংঘাত।

তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে যোগ্য হতে পারেন, কিন্তু নিজের সুবিধা অনুযায়ী যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করা এমন পদে থাকা ব্যক্তির জন্য মোটেই শোভন নয়।

জাদুঘরটির নিয়োগ বিধিমালা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রথমে ১০৭টি পদের জন্য একটি খসড়া তৈরি করলেও ফারুকী তা প্রত্যাখ্যান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে পদ ও নিয়োগ কাঠামো তৈরি করে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বাধীন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ। সেই কাঠামোতে লোকবল নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্তগুলো অনেক শিথিল করা হয়।

আরও পড়ুন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের শর্ত বহাল থাকলে ফারুকী নিজে গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার যোগ্যতা হারাতেন। তাকে চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ করে দিতেই শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হয়।

এই বিষয়ে আসিফ নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সময়সীমা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ৯৬টি পদের জন্য আবেদন করতে সময় দেওয়া হয়েছিল মাত্র সাত দিন। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আবেদনের জন্য অন্তত ২১ দিন সময় দেওয়া বাধ্যতামূলক।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একে অস্বাভাবিক তড়িঘড়ি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ ছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যোগ্যতা হিসেবে ‘জুলাইয়ের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করা’ বা ‘নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিশ্বাসী’ হওয়ার মতো আবেগপূর্ণ ও অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা সরকারি দাপ্তরিক ভাষায় বিরল।

নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে লিখিত পরীক্ষার বিধান থাকলেও সময় স্বল্পতার অজুহাতে কেবল মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, সময় কম থাকলেও সরকারি চাকরিতে লিখিত পরীক্ষা অপরিহার্য। অন্যথায় পুরো প্রক্রিয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির মুখে পড়ে।

এ ছাড়া নিয়োগ বাছাই কমিটিতে অভিজ্ঞ ক্যাডার কর্মকর্তাদের পরিবর্তে তুলনামূলক জুনিয়র ও পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছিল বলেও নথিপত্রে দেখা গেছে।

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও এই প্রকল্পের পিছু ছাড়ছে না। জাদুঘরের জন্য ১৯টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ‘মিনহাজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি সংস্থাকে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই প্রতিষ্ঠানের আগে কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা নেই। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, এই প্রতিষ্ঠানের সাথে ফারুকী বা তার সহযোগীদের যোগসূত্র থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

এই জাদুঘরের বিশাল কর্মযজ্ঞে নিয়োগের জন্য ১৩ হাজার আবেদন জমা পড়লেও এক হাজার ২০০ প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। বিস্তারিত অভিযোগ উল্লেখ করে তাকে লিখিত বার্তা পাঠানো হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad