বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটক—এই দুই মহীরুহের সাথে যে নামটি সমান্তরালে উচ্চারিত হয়, তিনি মৃণাল সেন। মঙ্গলবার(৩০ ডিসেম্বর) ছিল তার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৮ সালের এ দিনে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই কালপুরুষ বিদায় নিয়েছিলেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক অন্তহীন সৃজনশীল উত্তরাধিকার। মৃণাল সেন কেবল একজন পরিচালক ছিলেন
না, তিনি ছিলেন একজন সমাজতাত্ত্বিক। তার চলচ্চিত্রে সমাজ ও রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বিশেষ করে ষাট ও সত্তরের দশকের উত্তাল কলকাতার রাজনৈতিক অস্থিরতা, নকশাল আন্দোলন এবং সামাজিক অবক্ষয়কে তিনি যেভাবে পর্দায় তুলে এনেছেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। ‘ইন্টারভিউ’, ‘ক্যালকাটা ৭১’ এবং ‘পদাতিক’—এই তিন ছবির মাধ্যমে তিনি কলকাতার এক অস্থির সময়কে দলিলবন্দি করেছিলেন।
তিনি প্রথাগত গল্প বলার ব্যাকরণকে বারবার চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার সিনেমায় আমরা দেখি ‘ব্রেখশীয় ডিস্ট্যান্সিং’ বা দর্শককে ছবির সাথে সরাসরি যুক্ত করার কৌশল। ‘ভুবন সোম’ ছবির মাধ্যমে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে ‘নিউ ওয়েভ’ বা নতুন ধারার সূচনা করেন। তার ছবিতে আমরা যে মধ্যবিত্ত সমাজের দোদুল্যমানতা এবং চারিত্রিক জটিলতা দেখি (যেমন ‘একদিন প্রতিদিন’ বা ‘খারিজ’), তা আজও প্রাসঙ্গিক। ‘খারিজ’ ছবিতে একটি কিশোর ভৃত্যের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মধ্যবিত্তের যে মুখোশ তিনি খুলে দিয়েছিলেন, তা আজও আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।
মৃণাল সেনের প্রতিভা কেবল বাংলা বা ভারতের সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। কান, বার্লিন, ভেনিস ও মস্কোর মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি বহুবার পুরস্কৃত হয়েছেন। ১৯৮৩ সালে তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ২০০৫ সালে চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত হন।
মৃণাল সেন বিশ্বাস করতেন সিনেমা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি প্রতিবাদের ভাষা। তিনি আজ নেই, কিন্তু তার সৃষ্টি আজও আমাদের ভাবায়, প্রশ্ন করতে শেখায়। যখনই সমাজ কোনো সংকটের মধ্য দিয়ে যায়, যখনই মধ্যবিত্তের নৈতিকতা প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখনই মৃণাল সেনের সিনেমা হয়ে ওঠে আমাদের প্রধান পাঠ্য।


