এক বছরের কিছু বেশি সময় হলো দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি ১৪ বার বিদেশ সফর করেছেন। গড় হিসেবে যা প্রায় প্রতি মাসে একবার। এই নোবেলজয়ী একসময় দেশে সামাজিক উদ্ভাবন এবং নম্রতার প্রতীক ছিলেন। সেই তিনিই এখন দেশের সবচেয়ে ঘনঘন বিদেশ সফরকারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছেন।
যে মানুষটির সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো সংস্কার এবং দেশকে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাওয়া, সেই মানুষটির অতিরিক্ত ভ্রমণপ্রীতি এখন জনগণের বিরক্তির কারণ হতে শুরু করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইউনূস ইতালি, জাপান, চীন, থাইল্যান্ড, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, আজারবাইজান, মিশর, সুইজারল্যান্ড, ভ্যাটিকান সিটি এবং মালয়েশিয়া সফর করেছেন। শুধুমাত্র এপ্রিল মাসেই ৮৫ বছর বয়সী এই সরকারপ্রধান তিনটি দেশ সফর করেছেন। দেশগুলো হলো থাইল্যান্ড, কাতার এবং ভ্যাটিকান।
এসব সফরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়েছেন এবং চীনের বোয়াও ফোরাম, দুবাইয়ের ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট সামিট এবং টোকিওর নিক্কেই ফিউচার অফ এশিয়ার মতো বৈশ্বিক অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছেন।
আর এসব সফরে নিঃসন্দেহে মনোযোগের কেন্দ্রে ছিলেন আমাদের নোবেলজয়ী সরকারপ্রধান। আর স্পষ্টতই এই মনোযোগ তিনি উপভোগ করেন।
প্রধান উপদেষ্টার এই ঘন ঘন বিদেশ সফর থেকে আসলে কী পাওয়া যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন অনেকে। সবশেষ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সম্মেলনে যোগ দিতে ইতালির রোমে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সম্মেলনটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একজন প্রতিমন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূতের অংশগ্রহণই যথেষ্ট ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জন্য এই সম্মেলনে যোগ দেওয়া খুব সম্মানের কিছু নয়।
মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ফাঁকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে দেখা করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। মেলোনিরও শিগগিরই ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। ফলে রোমে তার সঙ্গে আরেকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বা ছবি তোলার আনুষ্ঠানিকতার আসলে কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।
মূল সমস্যাটি কেবল প্রধান উপদেষ্টার সফর নয়, বরং সমস্যা এসব সফরের উদ্দেশ্য ও সংখ্যায়। ১৪ মাসে ইউনূস ১৩টি দেশ ঘুরেছেন, কিন্তু দেশের মধ্যে কেবল চট্টগ্রামের, কক্সবাজার এবং রংপুরের মতো কয়েকটি জেলা সফর করেছেন। বৈশ্বিক উপস্থিতি এবং স্থানীয় অনুপস্থিতির এই ভারসাম্যহীনতা সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এমন এক সময়ে তিনি বিশ্বভ্রমণ করছেন যখন বাংলাদেশের জনগণ মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের সঙ্গে লড়াই করছে। আর তাদের নেতাকে দেশের চেয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য দেখা যাচ্ছে।
এসব কর্মকাণ্ড তার প্রশংসার পঞ্চমুখ এমন অনেক মানুষকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে। তারা বলছেন, যে ব্যক্তি একসময় তার সরলতা ও সামাজিক চেতনার জন্য প্রশংসিত ছিলেন তিনি এখন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছেন। অথচ সবার প্রত্যাশা ছিল যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে অন্য সরকারগুলোর চেয়ে আলাদা। তারা হবে পরিমিত, সংস্কারবাদী এবং জনমুখী।
তার বদলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে, শেখ হাসিনা, তার সরকারের মন্ত্রী বা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা যেমন দেশের টাকায় বিদেশ সফর করতেন, ঠিক একইভাবে জনগণের অর্থে বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও তার সহযোগীরা।
মুহাম্মদ ইউনূসের সমর্থকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে, তার বৈশ্বিক মর্যাদা বাংলাদেশকে বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে। যার ফলে সহজেই বিনিয়োগকারী, দাতা সংস্থা এবং উন্নয়ন অংশীদারদের মনোযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এই যুক্তির কিছু ভিত্তি তো অবশ্যই আছে।
জাপান ও চীনে তার বৈঠকগুলোয় বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য শক্তি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে এই দুটি ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার খুব কম বিদেশ সফরেরই সুস্পষ্ট ফলাফল পাওয়া গেছে।
উল্লেখযোগ্য কোনো বাণিজ্য চুক্তি হয়নি, দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের কোনো সমাধান আসেনি, কোনো বড় সহায়তা প্যাকেজ মেলেনি বা নতুন কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতিও চোখে পড়েনি। ফলে অধিকাংশ নাগরিকের চোখে সরকার প্রধানের এসব সফরের দৃশ্যমান ফলাফল ধরা পড়ছে না। অন্যদিকে সফরগুলোয় কেমন ব্যয় হচ্ছে সে সম্পর্কে তারা স্পষ্টই বুঝতে পারছেন।
বাংলাদেশ একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ যেখানে বিদেশে ব্যয় করা প্রতিটি অর্থ সমালোচনার জন্ম দেয়। ইউনূসের সহযোগীরা বেশ জোর দিয়েই বলছেন যে, প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীর বহর আগের সরকারের চেয়ে ছোট এবং কম জাঁকজমকপূর্ণ। তবুও তাদের সফরের সংখ্যা দেখে এর ব্যয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়াই যাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশের সরকারপ্রধানের মাসের পর মাস এই বিদেশসফরকে খুব প্রশ্রয়ের চোখে দেখার সুযোগ নেই। তিনি ও তার উপদেষ্টাদের এসব আন্তর্জাতিক সফর সাধারণ মানুষের এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছে যে, এই সরকার বিশ্বমঞ্চকে ভালোবাসলেও দেশের মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম থেকে তারা বিচ্ছিন্ন।
বিশেষ করে এই রোম সফর জনমনে রীতিমতো হতাশা সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এই সম্মেলনটি মর্যাদাপূর্ণ হলেও, সেখানে সরকারপ্রধানের উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল না। বিশেষ করে এমন একটি সরকারের প্রধান যিনি অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য ক্ষমতায় রয়েছেন।
বেশিরভাগ বাংলাদেশি যখন দেশে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান দামের সঙ্গে লড়াই করছে, তখন মুহাম্মদ ইউনূসের ঘনঘন বিদেশ সফরের বিষয়টি উপেক্ষা করা কঠিন।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নেতৃত্ব হলো অগ্রাধিকারের বিষয়। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য কখনোই পররাষ্ট্রনীতিতে বিপ্লব আনা ছিল না। এর কাজ হল প্রশাসনে সততা পুনরুদ্ধার, প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে আয়োজন করা। আর এসব কাজের জন্য সময়, মনোযোগ এবং দেশের মাটিতে তার উপস্থিতি প্রয়োজন। তার বদলে তিনি যদি বেশিরভাগ সময় উড়োজাহাজের প্রথম শ্রেণীতে বসে থাকেন, তাহলে সংস্কার বা সুষ্ঠু নির্বাচনে তার অবদান রাখা সম্ভব নয়।
একটা ক্ষেত্রে মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশংসা করতেই হয়। আর সেটি হলো তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে এখনও একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তিনি এমন অনেক সভা-সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন যেগুলোতে খুব কম বাংলাদেশিরই অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ এবং টেকসই অর্থনীতির জগতে তার নাম এখনও সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়।
কিন্তু তার এই বৈশ্বিক খ্যাতি এখন অনেকটা দ্বি-ধারী তলোয়ারের মতো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। দেশে মানুষ এখন এই প্রশ্ন করতে শুরু করেছে যে, নোবেল বিজয়ী এই নেতা অন্তর্বর্তী সরকারে তার ভূমিকাকে আন্তর্জাতিক সফরের ধারাবাহিকতা বলে মনে করছেন কিনা।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের দায়িত্ব সংযম ধরে রাখা, নিজের প্রচার করা নয়। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা, তিনি এমন নেতৃত্ব দেবেন যা ভবিষ্যতের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করবে। তার নামের সঙ্গে যে শৃঙ্খলা এবং বিনয় একসময় জড়িত ছিল তিনি ক্ষমতায় থেকেও সেসব চর্চা করবেন, এসবের মূর্ত প্রতীক হবেন। জবাবদিহিতা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতির উপর ভিত্তি করে গঠিত একটি সরকার কেবল সফরকারী হিসেবে পরিচিত হতে পারে না। জনগণ হাততালি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চায়।
মুহাম্মদ ইউনূস তার জীবনের বেশিরভাগ সময় বিশ্বের সামনে এই মতবাদ তুলে ধরেছেন যে, ‘ছোট মানেই সুন্দর’ এবং পরিবর্তনের শুরুটা হয় তৃণমূল থেকে। বিদ্রূপাত্মকভাবে এখন যখন তিনি দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত, তখন তিনি সেই তৃণমূল থেকেই সবচেয়ে বেশি দূরে বলে মনে হচ্ছে।
হয়ত তার পাসপোর্ট নানা দেশের ভিসার সিল-ছাপ্পরে ভরে গেছে। কিন্তু দেশের ভেতরে তার সফরের তালিকা এখনও ফাঁকা।
বাংলাদেশের এ মুহূর্তে একজন ‘হ্যাপি ফ্লায়ার’ বা ‘সুখী পরিব্রাজকের’ প্রয়োজন নেই। এই দেশের জন্য এখন এমন একজন নেতা প্রয়োজন যার পা আক্ষরিক অর্থেই মাটিতে থাকবে। মুহাম্মদ ইউনূস যদি জনগণের আস্থা ফিরে পেতে চান তাহলে তাকে দেশের ভেতরে দৃষ্টি ফেরাতে হবে। দৃষ্টি দিতে হবে গ্রামগুলোর দিকে, দৃষ্টি দিতে হবে কারখানায়, দৃষ্টি দিতে হবে সেইসব সংগ্রামরত পরিবারগুলোর দিকে যারা কোথাও উড়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে না।
বিশ্বের মানুষ মুহাম্মদ ইউনূসের কথা শুনতে সবসময়ই প্রস্তুত। কিন্তু এই মুহূর্তে তার ঘরে থাকা প্রয়োজন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ তাকে চাইছে।


