মিরপুরের আগুনে নিহতদের অর্ধেকের বয়স ১৮’র কম

মিরপুরের আগুনে নিহতদের অর্ধেকের বয়স ১৮’র কম
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে কিশোরী মাহিরার লাশের পাশে বসে আছেন তার হতবিহ্বল মা। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
Advertisement
Advertisement

ঢাকার মিরপুরে গার্মেন্টস ও রাসায়নিকের গুদামে লাগা ভয়াবহ আগুনে পুড়ে নিহত ১৬ জনের পরিচয় মিলেছে। এদের মধ্যে আটজনের বয়সই ১৮ বছর বা তার নিচে।

মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকায় এ আগুন লাগে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আগুন, পুড়ে যান আট নারী ও আট পুরুষ।

নিহতদের সবাই ছিলেন পোশাককর্মী। পরিচয় নিশ্চিতের পর জানা গেল নিহতদের অর্ধেকেরই বয়স ছিল ১৮ বছর বা তার নিচে। যাদের বয়স কাগজে-কলমে ১৮ বছর তাদের আদৌ ১৮ হয়েছে নাকি চাকরির প্রয়োজনে বয়স বাড়িয়ে লেখা হয়েছে সেটিও নিশ্চিত নয়।

অর্থাৎ বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এরা প্রায় সবাই শিশুশ্রমিক।

নিহত যে ‘শিশুশ্রমিক’দের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলো-বরগুনার বামনা উপজেলার মৃত ওমর ফারুকের মেয়ে মাহিরা আক্তার (১৪), ভোলার লালমোহন উপজেলার ওয়াজি উল্লাহর মেয়ে নার্গিস আক্তার (১৮), সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার ফারজানা আক্তার (১৫), নেত্রকোনার বারহাট্টার মার্জিয়া সুলতানা (১৮), নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের আসমা আক্তার (১৩), মদন উপজেলার মুনা আক্তার সামিয়া (১৬) এবং নাটোরের সিংড়া উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের আব্দুল আলিম (১৪) ও নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার তোফায়েল আহমেদ (১৮)।

রোজকার মতো সেদিনও তারা কাজে গিয়েছিল। কেউ নতুন চাকরি পেয়েছিল, কেউ বেতনের অপেক্ষায় ছিল। কৈশোরে আটকে থাকা এই ‘শিশুশ্রমিক’দের জীবন নিভেছে আগুনের লেলিহান শিখায়।

১৪ বছরের মাহিরা আক্তার গত ১ অক্টোবর থেকেই পুড়ে যাওয়া পোশাক কারখানায় কাজ করতে শুরু করেছিল। বেতন ধরা হয়েছিল সাড়ে ৭ হাজার টাকা। অবশ্য সে টাকা হাতে পাওয়ার আগেই মাহিরা পাড়ি জমিয়েছে অন্য জগতে। যেখানে বেতনের টাকার আর প্রয়োজন হয় না।

মাহিরার বাবা মারা গেছেন বহু আগে। সংসার চালাতে ১৫ বছরের বড় বোন সানজিদাও কাজ করে আরেকটি গার্মেন্টসে। সংসারের যে অভাব দূর করতে ১৪ বছরের মাহিরা যোগ দিয়েছিল কাজে, সেই অভাব আর কোনোদিনই দূর করতে পারবে না সে।

নিহতদের আরেকজন ১৬ বছর বয়সী মুনা আক্তার সামিয়া মাত্র তিন দিন আগে চাকরি শুরু করেছিল। ছয় মাস হলো বিয়ে হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে একটি নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল কিশোরী সামিয়া। আগুনে সেই স্বপ্নও ছাই হয়ে গেছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে স্বজনের মরদেহ আছে কিনা তা খুঁজে দেখছেন এক ব্যক্তি। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে স্বজনের মরদেহ আছে কিনা তা খুঁজে দেখছেন এক ব্যক্তি। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তার লাশ শনাক্ত করতে এসেছিলেন বোন চম্পা আক্তার। সামিয়ার পরনের গোলাপি সালোয়ার-কামিজ দেখে চিনেছেন মৃত বোনকে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে শিশুশ্রম অপরাধ। এই অপরাধ ঠেকাতে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের ৩১ শতাংশ কাজ করতে গিয়ে আহত হয়। এদের ৬৭ শতাংশই কাটাছেঁড়া, আঘাত বা দগ্ধ হয়।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে কর্মস্থলে সহিংসতার কারণে ২০ শিশুশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৬ সালের শ্রম আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে কাজে নিয়োগ দেওয়া আইনত অপরাধ; শাস্তি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, হাজার হাজার মাহিরা, মুনা, আসমারা এখনো বিভিন্ন কল-কারখানায় কাজ করে চলেছে।

বিবিএসের ২০২২ সালের ‘জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ’ বলছে, দেশে বর্তমানে ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৭ শিশু শ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৯৭ জন শিশু ‘শিশুশ্রম’-এর আওতায় পড়ে অর্থাৎ নিষিদ্ধ কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের সংখ্যা ১০ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি।

জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ অনুযায়ী, ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের যে কোনো কাজই শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য হবে, আর ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী কেউ যদি সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার বেশি কাজ করে, তা ‘ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম’।

তবু রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তে শিশুদের দেখা যায় রিকশার গ্যারেজে, নির্মাণস্থলে, চায়ের দোকানে বা কারখানায় কাজ করতে। যে বয়সে তাদের হাতে থাকার কথা বই, সে বয়সে হাতে তুলে নিতে হয় হাতুড়ি, সুই কিংবা বাঁধে নিতে হয় ভারী বস্তা।

দেশের অর্থনীতির বড় অংশ পোশাক খাত নির্ভর। রপ্তানির সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে। তাই যখন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক বা বাণিজ্য ঝুঁকি দেখা দেয়, ব্যবসায়ীরা উদ্বেগে পড়ে যান ‘দেশ বাঁচবে না, রপ্তানি বন্ধ হবে।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহ বুঝে নিচ্ছেন এক স্বজন। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহ বুঝে নিচ্ছেন এক স্বজন। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

কিন্তু যে শ্রমিকরা তাদের সেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখে তারা অনিরাপদ পরিবেশে বসে মাসে ৭ হাজার টাকা বেতনে কাজ করে। তারপর একদিন আগুনে পুড়ে বা ভবন ধসে মারা যায়।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ স্পষ্টভাবে বলেছে, কোনো শিশুকেও জীবিকা নির্বাহের জন্য শ্রমে নিয়োজিত করা যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় তদারকির দুর্বলতা শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে ‘আগুনের’ কারখানায়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে অন্তত ৩০০ ধরনের অর্থনৈতিক খাতে শিশুরা কাজ করছে। ৭০৯টি কারখানায় জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, মোট শ্রমিকের ৪১ শতাংশই শিশু; তাদের বেশিরভাগের বয়স ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। অধিকাংশই মেয়েশিশু, যাদের ৭১ শতাংশেরই শিক্ষার সুযোগ নেই। এদের অনেকেই ‘ক্রীতদাসের কাছাকাছি’ অবস্থায় কাজ করছে।

এছাড়া মিরপুরের এই আগুনে পুড়ে নিহতদের মধ্যে অনেক তরুণই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী।

নিহতদের মধ্যে ছয় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শ্রমিক হলেন–শেরপুরের ছানোয়ার হোসেন (২৫), গাইবান্ধার নূরে আলম সরকার (২৩), বরগুনার আল মামুন (৩৮), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রবিউল ইসলাম রবিন (২০), বরগুনার খালিদ হাসান সাব্বির (২৯) ও কুষ্টিয়ার নাজমুল ইসলাম রিয়াজ (৪০) এবং লালমনিরহাটের মৌসুমী খাতুন (২২) ও শরীয়তপুরের মুক্তা বেগম (৩৬)। নিহত কিশোরী মার্জিয়া সুলতানার স্বামী জয় মিয়াও (২০) একই আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন।

এ ছাড়া গুরুতর দগ্ধ তিনজন চিকিৎসাধীন আছেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad