সারা দেশে যানবাহনে অবৈধভাবে সিএনজি ও এলপিজি রূপান্তর ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। যথাযথ তদারকির অভাব এবং মানহীন সিলিন্ডার ব্যবহারের ফলে গাড়িতে বিস্ফোরণ ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
বর্তমানে দেশে পেট্রোল, অকটেন বা ডিজেল চালিত যানবাহনগুলোকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সিএনজি বা এলপিজিতে রূপান্তর করার প্রবণতা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে যত্রতত্র গড়ে ওঠা ওয়ার্কশপগুলোতে দেদারসে এই রূপান্তর কাজ চলছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিদের মতে, অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে নকল বা পুরোনো সিলিন্ডার ব্যবহারের সুযোগ থাকায় অনেক মালিক অবৈধ ওয়ার্কশপের দিকে ঝুঁকছেন। অনেক ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত বা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার পরিষ্কার করে নতুন করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী সিলিন্ডার স্থাপনের পর প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নিরাপত্তা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে অধিকাংশ সিলিন্ডারই স্থাপনের পর আর পরীক্ষা করা হয় না। এমনকি অনেক অসাধু চক্র সিলিন্ডারের গায়ে খোদাই করা মেয়াদের তারিখ পরিবর্তন করে ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে।
এই অনিয়মের পেছনে বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পুলিশের দুর্বল তদারকিকে দায়ী করেছে সিএনজি স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীতাকুণ্ড, রংপুর, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী, ধামরাই, সাভার ও আশুলিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ৬ অক্টোবর উত্তরার আব্দুল্লাহপুরে একটি প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
এমন ভয়াবহ সব দুর্ঘটনার পরও বিস্ফোরক অধিদপ্তর কোনো দায় নিতে নারাজ। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান বলেন, দুর্ঘটনার পর একে অপরকে দোষারোপের সংস্কৃতি চালু রয়েছে। যারা এসব ব্যবস্থার অনুমোদন ও নজরদারির দায়িত্বে আছেন, তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পর্যাপ্ত সক্ষমতাও নেই।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অনিয়মিত সিলিন্ডার স্থাপন এবং ত্রুটিপূর্ণ রিফিলিং প্রক্রিয়া যেকোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) সিএনজি পারমিশন ও মনিটরিং ম্যানেজার মো. মনোয়ারুল ইসলাম জানান, দেশে শুরুতে ১৮০টি রূপান্তর কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ৫৯টি। বাকি ১২১টি কেন্দ্র অকার্যকর হওয়ায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এই অনুমোদিত ৫৯টি কেন্দ্রের বাইরে যেকোনো রূপান্তর কার্যক্রম সম্পূর্ণ অবৈধ। এসব অবৈধ ওয়ার্কশপ বন্ধ করা এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পুলিশের দায়িত্ব।
তবে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. তোফাজ্জল হোসেন এই দাবি অস্বীকার করে জানান, সিএনজি রূপান্তর কেন্দ্র অনুমোদন ও তদারকির মূল দায়িত্ব আরপিজিসিএলের। তাই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে সেটি তারাই দেখবে।
বাজার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর দিলু রোড, সেগুনবাগিচা, মগবাজার, বাংলামোটর, মিরপুর মাজার রোড এবং উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের ওয়ার্কশপগুলোতে প্রকাশ্যে অবৈধ সিলিন্ডার কেনাবেচা চলছে। বর্তমানে ৯০ লিটারের সিলিন্ডারের তীব্র সংকট থাকায় পুরাতন সিলিন্ডার ঘষেমেজে বিক্রির ধুম পড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৯০ লিটারের সিলিন্ডারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই সিলিন্ডার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নাভানা সিএনজি লিমিটেডের বিক্রয় কর্মকর্তা কামরুজ্জামান মাসুদ জানান, তাদের কাছে বর্তমানে ৯০ লিটারের সিলিন্ডার নেই। সর্বশেষ তারা এটি এক লাখ ৩৮ হাজার টাকায় প্যাকেজ হিসেবে বিক্রি করেছেন।
অন্যদিকে, সাউদার্ন অটোমোবাইলস লিমিটেডের সুপারভাইজার গোলাম মোস্তফা জানান, দুবাইয়ের ৬০ লিটারের সিলিন্ডার ৬২ হাজার এবং ৯০ লিটারের সিলিন্ডার ৭৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হেলাল মটরসের কর্মচারী মনির হোসেন বলেন, দুবাই, ভারত ও কোরিয়ার তৈরি সিলিন্ডার ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সিলিন্ডারের চেয়ে গুণগত মানে ভাল হিসাবে পরিচিত। তিনি জানান, বর্তমানে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত মেয়াদ থাকা নতুন ১৩০ লিটারের সিলিন্ডার প্যাকেজের দাম ৮৬ হাজার টাকা। সেখানে ২০৩৫-৩৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদের পুরোনো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে ৬৪ হাজার টাকায়। একইভাবে ১০০ লিটারের পুরোনো সিলিন্ডার ৫২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোরঞ্জন ভক্ত এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি কক্সবাজারের কলাতলী স্টেশনে হওয়া সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের উদাহরণ দিয়ে বলেন, মূলত সিলিন্ডার স্থাপনার সঙ্গে যুক্তদের গাফিলতির কারণেই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর জানান, সিলিন্ডার সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে অনেকে সিএনজি চালিত গাড়িতে এলপিজি সিলিন্ডার স্থাপন করছেন, যা বিস্ফোরণের অন্যতম প্রধান কারণ। নিয়ন্ত্রণহীন এই রূপান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেন তিনি।


