মানবতাবিরোধী অপরাধে ইনুর কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

মানবতাবিরোধী অপরাধে ইনুর কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
হাসানুল হক ইনু। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে তিনটি অভিযোগে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর ৫০০ পৃষ্ঠার রায় প্রকাশিত হয় বলে রোববার ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মাহমুদুল হাসান টাইমসকে জানিয়েছেন। তিনি জানান, রোববার আসামিপক্ষকে রায়ের কপি সরবরাহ করা হয়েছে।

এর আগে ৩০ জুন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় দেয় । বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আদালত ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি প্রমাণিত বলে রায় দেয়। বাকি পাঁচটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবী সিফাত মাহমুদ টাইমসকে বলেন, ‘এই রায়ে ইনু ন্যায়বিচার পাননি। রায়ের বিরুদ্ধে আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করব।’

ইনুর অপরাধ কী

ট্রাইব্যুনালে আটটি অভিযোগে ইনুর বিচার হয়। এর মধ্যে তৃতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই ইনু ১৪ দলীয় জোটের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করেন। তিনি আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ওপর পূর্ববর্তী নির্যাতনের অনুমোদন দেন। ওই নির্দেশনার পর পুলিশ সুপারের অধীনস্থ পুলিশ বাহিনী এবং ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডাররা ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়।

এতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, বার্মিজ গলির সুরুজ আলী বাবু, হরিপুরগামী সড়কে শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, তুলাপট্টির গলির ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকের সড়কে চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। রাইসুল হকসহ আরও অনেকে আহত হন এবং অনেককে আটক করে নির্যাতন করা হয়। এই অভিযোগে ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

ষষ্ঠ অভিযোগ, ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে ইনু উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনের গতিপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্ররোচনা ও উস্কানি দেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডারদের পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দেন বলে ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করা হয়। এই অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সপ্তম অভিযোগ, ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে আন্দোলন দমনে বিভিন্ন পরামর্শ দেন। তিনি কারফিউ জারি, দেখামাত্র গুলি করে হত্যা, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, ছাত্র-জনতাকে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে গুলি, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উস্কানি এবং নির্দেশনায় সম্পৃক্ত ছিলেন।

৪ আগস্ট বিকালে কারফিউ জারি ও গুলি চালানোর সিদ্ধান্তকে তিনি অনুমোদন করেন এবং এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে ষড়যন্ত্রে অংশ নেন। নিজের দলের নেতাকর্মীদের মাধ্যমেও তা বাস্তবায়ন করেন। এই অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাকি পাঁচটি অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনাল তাকে খালাস দেয়।

বিচার প্রক্রিয়া

মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয় তদন্তের মাধ্যমে। গত বছরের ২৫ মার্চ তদন্ত শুরু হয় এবং ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত সংস্থা প্রসিকিউশনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাখিল করলে শুনানি শেষে সেদিনই আদালত অভিযোগ আমলে নেয়। পরে ২ নভেম্বর আটটি অভিযোগ গঠন করা হয়।

গত বছরের ১ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ১০ জন সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী, দুজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষী, একজন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য এবং জব্দ তালিকার দুজন সাক্ষী। আসামিপক্ষের পক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। চলতি বছরের ১৪ মে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে। পরে ২২ জুন আদালত ৩০ জুন রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ইনু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়ার নিজ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad