দৈনিক ভোরের কাগজ-এর অনলাইন প্রধান মিজানুর রহমান সোহেল-কে মাঝরাতে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া এবং ডিবি হেফাজতে রাখার ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সোহেল অনলাইন এডিটরস অ্যালায়েন্স-এরও সাধারণ সম্পাদক।
সাদা পোশাকে আসা কর্মকর্তারা নিজেদের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ পরিচয় দিয়ে মঙ্গলবার রাতে তাঁকে নিয়ে যান। জানা গেছে, তাঁকে মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিবি হেফাজতে টানা ১০ ঘণ্টা আটক রাখা হয়েছিল। বুধবার সকালে তাঁর স্ত্রীর জিম্মায় তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
উত্তর বাড্ডার বাড়ি থেকে মাঝরাতে তাঁকে তুলে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল এবং কোনো অভিযোগ ছাড়াই পরে তাঁকে কেন মুক্তি দেওয়া হলো—সেটি এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এই ঘটনা প্রসঙ্গে ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, “ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী পুলিশ কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকতে পারে। তবে, এর জন্য নির্দিষ্ট লিখিত ফৌজদারি অভিযোগ থাকা বাধ্যতামূলক।”
তিনি আরও বলেন, “ডিবি পুলিশ মিজানুরকে বেআইনিভাবে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়েছে। এটি একটি পেশাগত হুমকি এবং অনৈতিক কাজ।” তাঁর মতে, সাংবাদিকরা এমনিতেই চাপের মধ্যে কাজ করেন, আর এই ধরনের ঘটনা সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, কিছু রিপোর্টে এ ঘটনার সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষষ সহকারীর জড়িত থাকার কথা শোনা গেলেও, এর জন্য ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণ’ প্রয়োজন।
এদিকে যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক বাংলাদেশি সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, প্রধান উপদেষ্টার টেলিযোগাযোগ ও আইটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তায়্যেব-এর নির্দেশে ডিবি কর্মকর্তারা সোহেলকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও তায়্যেব এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ডিবি’র যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম এই বিষয়ে টাইমস’কে জানান, “ডিবি প্রধান কিছু তথ্য জানার জন্য সাংবাদিক সোহেলকে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর সাথে কথা বলার পর তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
সোহেলের স্ত্রী সুমাইয়া সিমা জানান, তাঁকে নিয়ে যাওয়ার সময় ডিবি কর্মকর্তারা কোনো ওয়ারেন্ট দেখাননি। আশরাফুল নামের এক কর্মকর্তা শুধু বলেছিলেন, ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। আলোচনার পরই তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। পরে আশরাফুল নামের এই কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মুক্তি পাওয়ার পর বুধবার সকালে সোহেল এ ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন। তিনি জানান, ডিবি প্রধানের সঙ্গে কথা বলার অজুহাতে জোর করে তাকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়। ডিবি অফিসে তাকে ১০ ঘণ্টার বেশি সময় হেফাজতে রাখা হয়।
ডিবি হেফাজতে তাকে অন্য আটককৃতদের সাথে রাখা হয় এবং তার জুতা ও বেল্ট খুলে নেওয়া হয় বলেও জানান সোহেল। তবে কেন তাঁকে আটক করা হলো, তা তিনি বা ডিবি কর্মকর্তারা কেউই জানতেন না।
সোহেল দাবি করেন, তাকে আটকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন(এনইআইআর) বাস্তবায়ন নিয়ে একটি প্রেস কনফারেন্স আটকে দেওয়া।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মাত্র নয়জন ব্যবসায়ীর সুবিধার জন্য সারাদেশে প্রায় ২৫ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীর ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়বে। এছাড়া এটি কার্যকর হলে দেশের গ্রামীণ মানুষ এবং প্রবাসীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
তবে সোহেলকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম। তার দাবি, একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের সময় ভুলবশত একটি আমন্ত্রণপত্রে সোহেলের মোবাইল নম্বর তালিকাভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়ার পর সোহেল সেই ভুল বুঝতে পারেন। এরপর তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাঁকে তাঁর স্ত্রীর জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে সোহেলকে ডিবি অফিসে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তায়্যেব। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তায়্যেব দাবি করেন, সোহেলের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বা পেশাগত কোনো সম্পর্ক নেই।
দেশের স্বার্থে এনইআইআর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে দাবি করে তায়্যেব আরো বলেন, সোহেলকে ডিবি পুলিশের ডেকে নিয়ে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রুটিন কাজের মধ্যেই পড়ে।


