মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ চুরি হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
বুধবার রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘ধান কেনার মৌসুমে সরকারি শর্ত ও অসময়ের অতিবৃষ্টিতে কৃষকের হাহাকার: সংকট ও উত্তরণের পথ’ শিরোনামে সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। এনসিপির কৃষি সেল এই সেমিনার আয়োজন করে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের কাছে বড় একটা অংশ জুড়ে রয়েছে কৃষি ব্যবস্থা। সেই কৃষি ব্যবস্থা থেকে চিন্তা করে মাওলানা ভাসানী তার দলের মার্কা রেখেছিলেন ধানের শীষ। সেই মার্কা চুরি হয়ে গিয়েছিল। মাওলানা ভাসানী এখনো আছেন, নাম আছে, কিন্তু মার্কাটা চুরি হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘মাওলানা ভাসানী কৃষক নির্ভর রাজনীতি বাংলাদেশে সূচনা করেছিলেন। যদি সেই ধানের শীষ মার্কাটা মাওলানা ভাসানীর কাছে থাকত, তাহলে আজ ধান পানির নিচে তলিয়ে যেত না। এখন বাস্তবের ধান পানির নিচে, কৃষক হাহাকার করছে। অথচ ধানের শীষ ক্ষমতায় আছে।’
কৃষি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘যে ধান আমাদের রক্ষা করার কথা ছিল, সেই ধান এখন ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। বগুড়ার মাঠ থেকে ধান গুলশানে চলে গেছে। কৃষকের পরিবর্তে এখন সিন্ডিকেটই লাভবান হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা স্মার্ট কার্ডের নামে অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়ে গেছে। এখন নতুন প্রকল্প এসেছে, খাল কাটার প্রকল্প, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড। আমরাও কার্ড এনেছি, লাল কার্ড। এগুলো যখন ব্যর্থ হবে আমরা তখন লাল কার্ড দেখাব।’
সীমান্ত পরিস্থিতি ও ভারতের রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘ভারতের কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চায়। তবে বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষা করবে।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনসিপির কৃষিবিষয়ক সম্পাদক গোলাম মর্তুজা সেলিম। তিনি বলেন, ‘দেশের ধান উৎপাদন ব্যাহত হলে তা শুধু খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নয়, জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’
গোলাম মর্তুজা সেলিম বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে আমরা দেখি সরকার অন্তত এক মাস আগে আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা দেয়। এটি ওইসব দেশের কৃষকদের জন্য চরমভাবে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে সরকার ডিজিটাল ডিজিটাল বলে কিন্তু কৃষকের জন্য জরুরি আগাম সতর্কতাটুকু দিতে পারে না।’
সেমিনারের মুখ্য আলোচক একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চলতি মৌসুমে উত্তরবঙ্গে সেচ সংকট এবং হাওর অঞ্চলের বন্যার কারণে দেশের বোরো ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দেশে খাদ্য সংকট ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদ বলেন, ‘কৃষির আলাপে এখন আমরা ধান নিয়েই কথা বলতে দেখছি, কিন্তু কৃষিতে আলুও একটি বড় ফ্যাক্টর। উত্তরাঞ্চলের কৃষক সড়কে আলু ফেলে ন্যায্য দাম না পাওয়ার প্রতিবাদ করছে। মানুষ দিশেহারা হয়ে আত্মহত্যাও করছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি ধান কেনার পুরো সিস্টেম সিন্ডিকেটনির্ভর। মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পায়, কৃষকরা পলিসির কাছে মার খেয়ে যায়। তারা পেরে ওঠেন না। খাদ্য নিরাপত্তার কথা বলি আমরা, এটি এখন স্বার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।’
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘কৃষকের ধান তলিয়ে যাচ্ছে আর সরকার টিকটকার কৃষককে কৃষি কার্ড দিচ্ছে। অথচ সরকারের উচিত ছিল সহযোগিতা করা, হারভেস্টর এবং ধান শুকানোর প্রযুক্তি দিয়ে বিভিন্নভাবে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো। বিপুল সংখ্যক খাদ্য কর্মকর্তা আছেন, কৃষি কর্মকর্তা আছেন, তারা কী করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি কার্ডের তামাশা বাদ দিয়ে কৃষি বীমা চালু করা উচিত। মিলারের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা উচিত, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী যেমন বলেছিলেন চিকিৎসা যেতে হবে জনগণের দুয়ারে দুয়ারে, সেভাবে সরকারকে কৃষকের দুয়ারে দুয়ারে যেতে হবে। ফসলের দাম আগেই নির্ধারণ করতে হবে, আগেই বলে দিতে পারলে কৃষক বার্গেইন করতে পারবে সঠিকভাবে। সরকার ধান কম কেনে চাল বেশি কেনে, এই নীতি থেকে সরে আসতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার কৃষকের সমস্যা সমাধান করতে পারছে না বরং তা আরও বাড়িয়ে তুলছে। এবার কৃষকরা যে বিপদে পড়েছে সেটি প্রাকৃতিক কিন্তু সরকার চাইলে সতর্কতামূলক উদ্যোগ নিয়ে তা কমাতে পারত। সরকার সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’
জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম ফকির বলেন, ‘হাওরের কৃষক চৈত্র মাসের শেষ থেকে বৈশাখের শুরতে ফসল তোলে। কিন্তু আজ ৩০ বৈশাখ, এখনো ফসল তুলছেন কৃষকরা। বীজ বিতরণ এবং বিপননের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে বিলম্বের কারণে এটি হয়েছে। এইসব লোকজনকে শাস্তির আওতায় আনা দরকার।’
ন্যাশনাল হেলথ এলায়েন্সের আহ্বায়ক শাদরুল আলম বলেন, ‘বাজেটে কীভাবে কৃষকদের সহজ শর্তে লোন দেওয়া যায়, তা দেখতে হবে এবং তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।’


