মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ: কার সহ্যক্ষমতার পাল্লা কত ভারি?

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ: কার সহ্যক্ষমতার পাল্লা কত ভারি?
তেহরানের একটি পুলিশ স্টেশনে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে উড়ছে ইরানের জাতীয় পতাকা। ছবি: রয়টার্স
Advertisement
Advertisement

গত শনিবার এক আকস্মিক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে, তা দ্রুতই এক দীর্ঘস্থায়ী এবং অঞ্চলটির খোলনলচে বদলে দেওয়ার মতো যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। বর্তমানে একদিকে আমেরিকা ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে ক্রমাগত হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে তেহরানও ইসরায়েল এবং তার আশপাশের রাষ্ট্রগুলোতে ড্রোন ও মিসাইল নিক্ষেপ করে পাল্টা জবাব দিচ্ছে। এই সংঘাত এখন আর কেবল একটি সীমিত সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকে থাকার লড়াই, আত্মমর্যাদার লড়াই এবং রাজনৈতিক অস্তিত্বের এক কঠিন পরীক্ষা।

ইরানের জন্য এই লড়াইয়ের গুরুত্ব এখন অস্তিত্ব রক্ষার পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা এবং শীর্ষস্থানীয় নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করায় ইসলামিক রিপাবলিকের ভিত বেশ নাড়া খেয়েছে। সামরিক হিসাব-নিকাশের বাইরেও এই যুদ্ধ ইরানি জনগণের মধ্যে জাতীয় গর্ব, ধর্মীয় আবেগ এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। অনেক ইরানীর কাছে এটি এখন আর কেবল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও সম্মানের প্রশ্ন। এমন পরিস্থিতিতে ক্রমাগত সামরিক চাপ সত্ত্বেও তেহরানের সহজে পিছু হটার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল তাদের এই অভিযানকে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কে সাজিয়েছে, যার অন্যতম উদ্দেশ্য ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা বা পুনর্গঠন করা। কিন্তু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। এখন পর্যন্ত ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দৃশ্যমান কোনো অর্জন ছাড়া এই যুদ্ধ থেকে সরে আসা হবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য বড় ধরনের মর্যাদাহানি। এতে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় রাখার ক্ষমতা বা ‘ডিটারেন্স’ সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ফলাফল এখন বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিকেন্দ্রীভূত সামরিক কাঠামোর দৃঢ়তা, দীর্ঘস্থায়ী হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েলের সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে মার্কিন জনমতের সহনশীলতা এবং সংঘাতের মাঝে পড়ে যাওয়া আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে বাহরাইন এবং কাতারের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলো তাদের কৌশলগত অবস্থানের কারণে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সৌদি আরবের মতো বড় দেশগুলোর অর্থনীতিও নির্দিষ্ট কিছু হাব এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে এই দেশগুলো অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থামাতে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াবে।

আরও পড়ুন

জনমতও এই সংকটে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলের প্রধান শহরগুলোতে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সাধারণ মানুষের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। আবার আমেরিকাতেও এই যুদ্ধের পরিধি এবং উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় বাড়ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের সমর্থন খুবই কম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সম্প্রতি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যথার্থই বলেছেন, গত কয়েক দিনে আসলে কী ঘটেছে এবং আগামী সপ্তাহ বা মাসগুলোতে এর প্রভাব কী হতে পারে, তা অনেকেই এখনও পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছেন না। তার এই মন্তব্য বর্তমান সংকটের অনিশ্চয়তাকেই স্পষ্ট করে তোলে।

বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও এই যুদ্ধের কালো ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবাহিত হয়। এই পথ যদি কোনোভাবে বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হয়, তবে এর প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার, জাহাজ চলাচল এবং সরবরাহ ব্যবস্থা এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

পরিশেষে বলা যায়, এই যুদ্ধ সম্ভবত রণক্ষেত্রের জয়ের চেয়ে সহ্যক্ষমতার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ কোন পক্ষ বেশি ক্ষতি সইতে পারে, অভ্যন্তরীণ চাপ সামলাতে পারে এবং রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রাখতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে সব। তীব্র আবেগ এবং অনড় লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন এমন এক পথে হাঁটছে যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট রাস্তা বা ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ কারো কাছে নেই। তেহরানের অবাধ্যতা নাকি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জেদ শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে, তা অনিশ্চিত। তবে এটি পরিষ্কার যে, এই যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তার চরম মূল্য দিতে হবে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বকে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad