যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করায় মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ৫০ লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের কোনো স্পষ্ট সমাধান না মেলায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সংঘাতের ফলে ইতোমধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের এই নেতিবাচক প্রভাব এশিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে অনুভূত হলেও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি। কারণ বাংলাদেশ তার জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটানো এবং রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের জন্য বহুলাংশে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে বাংলাদেশকে ‘দ্বিমুখী ধাক্কা’র মুখোমুখি হতে হবে। একদিকে জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি খরচ এবং অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর মারাত্মক আঘাত হানতে পারে।
উল্লেখ্য, প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, যা কোটি কোটি মানুষের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখে। এই যুদ্ধ যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মসংস্থানকে ব্যাহত করে, তবে দেশের অর্থনীতির এই প্রধান ভিত্তিটি দুর্বল হয়ে পড়বে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল অর্থাৎ বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ বিদেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন, যাদের বেশিরভাগই দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিক। এই বিশাল শ্রমবাজারের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, একজন প্রবাসী শ্রমিক গড়ে দেশে থাকা চার থেকে পাঁচজন সদস্যের ভরণপোষণ করেন। এর অর্থ হলো বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে মধ্যপ্রাচ্যের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে এসব শ্রমিক ও দেশে থাকা তাদের পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ তেল, গ্যাস, নির্মাণ ও সেবা খাতে নিয়োজিত। কিন্তু যুদ্ধের মাঝে নিরাপত্তার খাতিরে ইতিমধ্যে অনেক জ্বালানি স্থাপনা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ধীর হয়ে গেছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের ভয়, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাই করতে পারে বা কার্যক্রম একেবারে গুটিয়ে নিতে পারে।
চাকরি হারানোর ভয়ের পাশাপাশি শ্রমিকদের শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানায় প্রবাসীরা জীবনের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সরকারি সূত্রমতে, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইতিমধ্যে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ২৬ লাখ, কুয়েতে ৩ লাখ ৫০ হাজার, কাতারে ৪ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৮ লাখ ৪০ হাজার এবং বাহরাইনে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন।
চলমান এই পরিস্থিতি শ্রমিকদের আত্মবিশ্বাস ব্যাপকভাবে নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিশেষ করে যারা দৈনিক মজুরিতে বা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, তারা এখন নিয়মিত কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. রইস হাসান সারোয়ার বর্তমান অবস্থাকে অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সংঘাতের কারণে অঞ্চলের অনেক অংশে উৎপাদন কার্যক্রম ইতিমধ্যে হ্রাস পেয়েছে।
রাষ্ট্রদূত সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অভিবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমানে দৈনিক মজুরিতে কাজ করা শ্রমিকরা নিয়মিত কাজ না পাওয়ায় সংকটে রয়েছেন। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে স্থায়ী চাকরিতে থাকা কর্মীরাও ছাঁটাইয়ের মুখে পড়তে পারেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের দেশে ফিরে আসতে হতে পারে।


