ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে এক চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই সংকটের মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। এর ফলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো একতরফাভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ায় ছোট রাষ্ট্রগুলো ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করার এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংকট তৈরি করতে পারে।
চলমান এই সংঘাতকে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামরিক চাপের মাধ্যমে দেশটির শাসন কাঠামোকে দুর্বল বা পুনর্গঠন করার চেষ্টা চললেও বিশ্লেষকরা ভিন্ন সম্ভাবনা দেখছেন।
ঐতিহাসিকভাবে বাহ্যিক আক্রমণ ইরানি সমাজকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে তোলে, যার ফলে এই সংঘাত স্বল্পস্থায়ী না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ইরানের বর্তমান সরকারের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক যে জনসমর্থন রয়েছে, তাতে এই লড়াই গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পদ্ধতিগত পতনের একটি উদ্বেগজনক লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা একটি আইনহীন আন্তর্জাতিক পরিবেশ দেখছি যেখানে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অথচ কোনো নতুন বা স্থিতিশীল কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।’
তিন বছর ইরানে দায়িত্ব পালন করা এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক আরও বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার ভাগ্য শেষ পর্যন্ত সে দেশের জনগণই নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক নিরাপত্তার গ্যারান্টার হিসেবে ওয়াশিংটনের যে প্রথাগত ভাবমূর্তি ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। শক্তিশালী দেশগুলো কোনো আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা নিয়ম-ভিত্তিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল ছোট দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এদিকে, যুদ্ধের দামামায় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ ঘিরে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বে ব্যবহার করা মোট তেলের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেলের বেশি তেল এই পথ দিয়ে যায়।
বিভিন্ন তথ্যে জানা গেছে, ইরানের নৌ-তৎপরতার কারণে এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে মেয়ারস্ক, সিএমএ সিজিএম এবং হ্যাপাগ-লয়েড-এর মতো বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো এই রুটে তাদের জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ থেকে ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে খাদের কিনারে নিয়ে যাবে। এর ধাক্কা সামলানো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কঠিন হবে। তার মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে মুদ্রাস্ফীতির চাপে থাকা দেশগুলোর অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সামাজিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।
মোমেন বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলো বিনিয়োগ-নির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে যখন বিনিয়োগের পরিবেশ ব্যাহত হয়, তখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয় এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকটের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। যদি এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে বাণিজ্য পথ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগাম পরিকল্পনার ওপর বিশেষ জোর দিতে বলেছেন শহীদুল হক। তিনি বলেন, সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আগেই নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু করা দরকার।
সরকারের উচিত অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা, যারা সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো পর্যালোচনা করে জরুরি মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণ করবে।


