লালমনিরহাটের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার প্রধান ভিত্তি তিস্তাকে বাঁচাতে এবার নির্বাচনের প্রধান হাতিয়ার ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। আসন্ন নির্বাচনে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের দরজায় যাচ্ছেন প্রার্থীরা।
এক সময়ের প্রমত্তা তিস্তা আজ মৃতপ্রায়। ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশে। লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলের ৫টি জেলার কৃষি ও জীবনযাত্রার প্রাণভোমরা এই নদী। কিন্তু কয়েক দশক ধরে শুষ্ক মৌসুমে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার আর বর্ষায় বিনা নোটিশে পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে তিস্তাপারের প্রায় ২ কোটি মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে সেসব ছিল কেবল আশ্বাস আর শুভেচ্ছা বিনিময়েই সীমাবদ্ধ। মাঝে চীনের অর্থায়নে প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র প্রস্তাব আসে। কিন্তু ভারতের আপত্তি এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের অজুহাতে তৎকালীন সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে গত দেড় দশকে তিস্তা কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার বিষয় হয়েই ছিল। বাস্তবে এর কোনো সুফল লালমনিরহাটসহ ৫ জেলার মানুষ পায়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিস্তাপাড়ে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার হয়। ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাও’ স্লোগানে “তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন” ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলন তীব্র করে। এতে বিভিন্ন সংগঠন, রাজনৈতিক দলসহ কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেয়। আন্দোলনে পদযাত্রা, সমাবেশ, মশাল প্রজ্বলন এবং নদীপারের ১১টি পয়েন্টে ৪৮ ঘণ্টা লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা তিস্তাপাড়ে গণশুনানি করেন। তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে। চীনের প্রতিনিধি দল কারিগরি নকশাও চূড়ান্ত করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আবারও ধোঁয়াশায় পড়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। জানুয়ারি শেষ হতে চললেও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না থাকায় হতাশায় ডুবেছে তিস্তাপারের মানুষ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থীরা এখন তিস্তা ইস্যুকে ভোট টানার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। কর্মসংস্থান, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সবার প্রধান প্রতিশ্রুতিই এখন তিস্তাকে ঘিরে।
লালমনিরহাট-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জাহিদ হাসান লিমন বলেন, “তিস্তা আমাদের মায়ের মতো। বিগত সরকার ভারতের দিকে তাকিয়ে থেকে আমাদের এই মাকে তিলে তিলে মেরেছে। নির্বাচিত হলে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংসদে জোরালো দাবি তোলা হবে।”
পিছিয়ে নেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবু তাহের। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে নদী শাসন ও খনন কাজের মাধ্যমে মানুষের দুর্দশা দূর করা হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
অন্যদিকে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু বিএনপির প্রার্থী। তিনি বলেন, “তিস্তা আমাদের হৃদয়ের মতো। একসময়ের আশীর্বাদ এই নদী এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে।”
দুলু জানান, অতীতে সরকারগুলো মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কাজ শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই কাজ শুরু করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদে’র সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম কানু বলেন, বর্ষায় যে নদী ৩-৫ কিলোমিটার প্রশস্ত হয়, এখন সেখানে এখন হাঁটু পানিও নেই। সরকার ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও নদীপারের বাসিন্দাদের ভাগ্য বদলায় না। মানুষ এখন বুকভরা আশা নিয়ে নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে।


