মাঠের ধুলোমাখা জার্সিটা হয়তো তখনো ঠিকমতো শুকায়নি, কিন্তু তার চোখেমুখে ছিল এক প্রশান্তির ছাপ। তিনি শেখ মোরসালিন, বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের আদরের ‘স্টার বয়’। বয়সটা কম, কিন্তু কাঁধে নিয়েছেন কোটি মানুষের প্রত্যাশার ভার। ‘ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মেতেছিলেন এই তরুণ তুর্কি। কথা বললেন নিজের উঠে আসা, ভারত বধের গল্প, হামজা চৌধুরীর প্রভাব এবং আবাহনী-মোহামেডানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে।
মোরসালিন, আজ আপনি তারকা ফুটবলার, সবাই একনামে চেনে। এই ফুটবলার হওয়ার শুরুটা আসলে কোন জায়গা থেকে?
শেখ মোরসালিন: শুরুটা আসলে বিকেএসপি থেকে। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল ফুটবলার হওয়ার, সেই স্বপ্ন থেকেই বিকেএসপিতে আসা।
যখন বিকেএসপিতে খেলা শুরু করলেন, তখন কি ভেবেছিলেন যে এত দ্রুত জাতীয় দলে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন?
শেখ মোরসালিন: আত্মবিশ্বাস ছিল যে পারব। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি পারব কি না, সেটা জানা ছিল না। তবে খেলার শুরুর দিকে সবারই স্বপ্ন থাকে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার। সেটি করতে পেরে এখন বেশ ভালোই লাগছে।
আপনাকে তো সবাই এখন ‘স্টার বয়’ বলে ডাকে। এই যে একটা ট্যাগ, এটার অনুভূতিটা কেমন? কোনো চাপ অনুভব করেন কি?
শেখ মোরসালিন: না, শুরুর দিকে একটু প্রেশার লাগত। কিন্তু এখন আলহামদুলিল্লাহ, বিষয়টা স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
বিষয়টা কি এখন উপভোগ করেন?
শেখ মোরসালিন: হ্যাঁ, এখন উপভোগ করি। এখন চিন্তা করি, মানুষ আমাকে ভালোবাসে। তাই আমাকে সবসময় ভালো খেলতে হবে, ভালো করতে হবে এটাই মাথায় থাকে।
আপনার জীবনে বেশ কিছু কঠিন সময় এসেছে, যা আমরা জানি। সেই মুহূর্তগুলোতে নিজেকে ধরে রাখা, মানসিক শক্তি অটুট রাখা এবং তা উতরে আবার পারফর্ম্যান্সে ফিরে আসা এটা কতটা কঠিন ছিল? কীভাবে সামলেছেন?
শেখ মোরসালিন: ভাই, আমি যখন পিচের মধ্যে যাই, আমার আসলে বাইরের কিছু মনে থাকে না। তখন আমার ফোকাস সবসময় ফুটবলেই থাকে। তাই বাইরের কোনো কিছু আমাকে মাঠের ভেতরে প্রভাব ফেলতে পারে না।
হামজা চৌধুরী দলে আসার পর বাংলাদেশের মাঠের পারফর্ম্যান্সে অনেক উন্নতি দেখছি। মাঠের পারফর্ম্যান্স ছাড়া দলের ভেতর আর কী কী পরিবর্তন এসেছে?
শেখ মোরসালিন: আসলে পুরো পরিবেশ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন সবাই ফুটবল খেলা দেখে, আপনারা সাংবাদিকরাও সবসময় আমাদের খোঁজখবর রাখেন। আমাদের ডিসিপ্লিন থেকে শুরু করে সব জায়গায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। এটার জন্য আমি বিশেষ করে বাফুফেকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।
ভারত ম্যাচে আপনার পাস থেকেই গোলের শুরু, এরপর রাকিবের পাস এবং আপনার গোলে জয়। ম্যাচের আগে মানসিকতা কেমন ছিল? কারণ সামিত সোম কিছুদিন আগে বলেছিলেন, তিনি যখন প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন, সবাই তাকে বলছিল ভারত ম্যাচটা জিততে হবে। ড্রেসিংরুমে ভারত ম্যাচ ঘিরে কেমন পরিবেশ ছিল? আর জয়ের পর অনুভূতি কেমন?
শেখ মোরসালিন: সবকিছুর জন্য আলহামদুলিল্লাহ। ভারতের সঙ্গে খেলা মানেই আমাদের বাংলাদেশিদের একটা আলাদা আবেগ কাজ করে। পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে একটু রেষারেষি তো থাকবেই। এর আগেও আমার ভারতের বিপক্ষে খেলার সুযোগ হয়েছে। কাগজে-কলমে ওরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো ও এগিয়ে থাকা দল। কিন্তু পারফর্ম্যান্স হয়তো আপনারা দেখেছেন, আমরা এখন অনেক ভালো দল। আলহামদুলিল্লাহ সবকিছুর জন্য। আর ভারতের বিপক্ষে খেলা হলে আমরা মানসিকভাবেও প্রস্তুত থাকি যে, যেভাবে হোক ম্যাচটা জিততে হবে। এমনকি সাম্প্রতিক পারফর্ম্যান্স দেখে ওরাও এখন আমাদের ভয় পায়।
গোলটা হওয়ার পর অনুভূতি কেমন ছিল?
শেখ মোরসালিন: আলহামদুলিল্লাহ, ম্যাচটা জিতেছি এটাই বড় কথা। হয়তো আমি গোল করলাম কিন্তু ম্যাচ ড্র হলো বা হেরে গেলাম, তাহলে এত ভালো লাগত না। যেহেতু ম্যাচ জিতেছি, তাই আমি খুবই খুশি।
বাংলাদেশ ফুটবলকে পাঁচ বছর পর কোথায় দেখতে চান?
শেখ মোরসালিন: আসলে ঠিক ওইভাবে না, আমি চাই আমরা যেভাবে একটা উন্নতির ধারায় আছি, সেটা বজায় থাকুক। গত তিন বছর ধরে আমি জাতীয় দলে আছি, আমরা দিন দিন উন্নতি করছি। অবশ্যই পাঁচ বছরের একটা টার্গেট থাকা উচিত। তবে আমার বর্তমান লক্ষ্য হলো, যেকোনোভাবে সাফ টুর্নামেন্ট জেতা। এরপর এএফসি কোয়ালিফায়ার ম্যাচগুলোতে ভালো করে ইনশাআল্লাহ বিশ্বকাপ খেলা।
নারী দল এএফসিতে সুযোগ পাচ্ছে, বয়সভিত্তিক ও মূল দলে ভালো করছে। এটা আপনাদের কতটা অনুপ্রেরণা জোগায়?
শেখ মোরসালিন: অবশ্যই অনুপ্রেরণা জোগায়। আমাদের চেয়ে ওদের জয়ের হার অনেক সময় বেশি দেখা যায়। ওরা অনেক গোল করে, ম্যাচ জেতে। ওদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু নেওয়ার আছে। আমরা ওদের জন্য গর্বিত।
আপনি আবাহনী, মোহামেডান এবং বসুন্ধরা কিংসের মতো জায়ান্ট ক্লাবে খেলেছেন। দেশের ঐতিহাসিক এবং সেরা ক্লাবগুলোতে খেলার অনুভূতি কেমন?
শেখ মোরসালিন: এটা খুবই ভালো লাগার বিষয়। তবে সবথেকে বড় বিষয় হচ্ছে, আবাহনী-মোহামেডানেই আপনি ‘রিয়েল ফ্যান’ পাবেন। এরা কোনো কিছুর বিনিময়ে খেলা দেখতে আসে না। ছোটবেলা থেকে খেলা দেখে আসছে, এমনকি অনেক বয়স্ক মুরুব্বিরাও খেলা দেখতে আসেন। এমন ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে খেলার সৌভাগ্য হয়েছে, এটা ভেবে ভালো লাগে।
ফুটবলের এই যে গণজাগরণ, মানুষ এত খেলা দেখছে ফ্যানদের জন্য আপনার কোনো বার্তা আছে?
শেখ মোরসালিন: ফ্যানদের উদ্দেশে এটাই বলব, গত ম্যাচগুলোতে আপনারা যেভাবে ভালোবাসা দেখিয়েছেন এবং দেখাচ্ছেন, তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আপনাদের সবার কাছে আমি এবং আমার পুরো টিম কৃতজ্ঞ। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, আপনারা এভাবেই আমাদের সাপোর্ট করবেন। আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশ দলকে আরও অনেক উচ্চতায় নিয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ।


