ভারতের পার্লামেন্টে বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে লাঠিচার্জ করেছে দিল্লি পুলিশ। এতে বিক্ষোভের অনুমতি না থাকলেও সোমবার দেশটির রাজধানীতে সমবেত হওয়া হাজারও বিক্ষোভকারীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়, দেশটির মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য সমন্বিত পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা খাতে অনিয়মের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে (সিজেপি)।
সংসদ অভিমুখে মিছিল শুরুর জন্য পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সোমবার সকাল থেকে ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকেরা দিল্লির যন্তর মন্তরের নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে জড়ো হন। বিক্ষুব্ধদের অধিকাংশই ভারতীয় তরুণ-ছাত্রজনতা।
এ সময় ককরোচ পার্টির সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে দিল্লি পুলিশ লাঠি ও ব্যাটন ব্যবহার করে। মধ্য দিল্লির কয়েকটি এলাকায় জ্যামার দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় মুঠোফোনের পরিষেবা।
এমন পরিস্থিতিতে সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানায় সিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘কোনো স্থানে আপনাদের আটকে দেওয়া হলেও শান্ত থাকুন এবং শান্তি বজায় রাখুন। শান্তি ও ভালোবাসার মাধ্যমেই আমরা জয়ী হব।’
নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে দিল্লির রাজীব চক, জনপথ, প্যাটেল চক, কেন্দ্রীয় সচিবালয় ও সেবা তীর্থ- এই পাঁচটি মেট্রোরেল কেন্দ্র পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
এতে বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি মেট্রোরেল কেন্দ্রগুলোতে সাধারণ মানুষদেরও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শত শত যাত্রী পথে আটকা পড়েন অথবা গন্তব্যে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে বাধ্য হন।

এদিকে দিল্লি পুলিশ গত রোববারই সিজেপির কর্মসূচির অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে বড় ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় পুলিশ জানায়, ‘পূর্বানুমতি নিয়ে যন্তর মন্তরের নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল ছাড়া অন্য কোথাও প্রতিবাদ মিছিল, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ এবং পাঁচ বা তার বেশি মানুষের সমাবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।’
‘দিল্লি পুলিশ সব নাগরিককে আইন মেনে চলতে, কোনো অননুমোদিত জমায়েত বা মিছিলে অংশ না নিতে এবং জনশান্তি, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বজায় রাখতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছে।’
গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশটির শিক্ষার্থীদের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করলে এ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ‘আমরাই তেলাপোকা’ ও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে ব্যঙ্গধর্মী হ্যাশ ট্যাগ ছড়িয়ে পড়ে।
মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে উঠলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সমর্থনে দেশের বাইরে থেকেই সরকারের সমালোচনা বিষয়ক সংগঠন হিসেবে ককরোচ জনতা পার্টি চালু করেন অভিজিৎ দীপকে। কয়েক দিনের মধ্যেই সংগঠনটি ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। বিরোধী দলের বিভিন্ন রাজনীতিক, অধিকারকর্মী, শিল্পী ও ক্রীড়াবিদসহ কোটি কোটি অনুসারীর সমর্থন পায় সংগঠনটি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের পর শিক্ষা খাতে সংস্কারের দাবিতে দিল্লির বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিতে দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের পর গত জুনে দেশে ফেরেন অভিজিৎ দীপকে। পরে তার সঙ্গে যোগ দেন লাদাখের জনপ্রিয় অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। সিজেপির কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে তিনি ২৮ জুন যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন।
তবে টানা ২১ দিনের অনশনের পর ৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতির শঙ্কা জানিয়ে ভারতীয় আদালতের নির্দেশে গত শনিবার বিক্ষোভ মঞ্চ থেকে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
দিল্লির সফদরজং হাসপাতাল থেকে পাঠানো চিঠিতে নিজের অবস্থাকে ‘অবৈধ আটক’ হিসেবে বর্ণনা করে ওয়াংচুক জানান তার তিনটি শর্ত পূরণ হলে তিনি অনশন ভাঙার কথা বিবেচনা করবেন।
প্রথম শর্ত- শিক্ষাব্যবস্থার কথিত ব্যর্থতা, বিশেষ করে সাম্প্রতিক নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় সরকারকে স্বীকার করতে হবে।
দ্বিতীয় শর্তে ওয়াংচুক জানান, বিরোধীদলসহ অন্য রাজনৈতিক নেতাদের নিশ্চয়তা দিতে হবে- প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হবে।
তৃতীয় দাবি, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য কারণে তিনি সোমবারের সংসদ অভিমুখে মিছিলে অংশ নিতে না পারলে আন্দোলনের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের হাসপাতালে তার সঙ্গে দেখা করে প্রথম দুই শর্ত পূরণের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
‘অবৈধ আটকে’ তার চলাচল, বাক্প্রকাশ এবং সব ধরনের যোগাযোগের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে বলেও জানান ওয়াংচুক।

ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো রোববার দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি চান। তবে আদালত তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আদালত উল্লেখ করে, শারীরিক অবস্থার অবনতি সত্ত্বেও ওয়াংচুক নিজে হাসপাতালে ভর্তি না হওয়ায় তাকে সফদরজং হাসপাতালে স্থানান্তর করার অধিকার সরকারের ছিল।
বিচারপতি মিনি পুষ্কর্ণা বলেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তার সম্মতিতে মুখে খাওয়ার ওষুধ দিয়েছেন। তাই বলা যায় না, ওয়াংচুকের চিকিৎসায় বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে বা তার ব্যক্তিস্বাধীনতা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এ পর্যায়ে কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’


