‘বাংলাদেশি’ দাবি করে জোরপূর্বক ‘ঠেলে পাঠানো’ ছয় ভারতীয়কে অবিলম্বে ভারতে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। এভাবে ঠেলে দেওয়াকে ‘বেআইনি’ বলেও মন্তব্য করেছে আদালত।
শুক্রবার বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। এতে বলা হয়, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ ভুক্তভোগী ওই ছয়জনকে ফেরত আনতে হবে।
নয়াদিল্লিতে স্বামীর সঙ্গে ইটভাটায় কর্মরত পশ্চিমবঙ্গের সোনালী বিবি ‘বাংলাভাষী’ হওয়ায় গত ২০ জুন তাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ দাবি করে আটক করে ভারতীয় পুলিশ। সোনালী তখন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পরে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেয় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী(বিএসএফ)। সঙ্গে আরও চারজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতোমধ্যে আদালতের এই আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে অনুরোধ করেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। তবে সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে হাইকোর্ট। এরপর কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে রায় কার্যকরের সময় বাড়ানোর আবেদন করা হলে সেটিও নাকচ করে দেয় বিচারপতির বেঞ্চ।
একইসঙ্গে ওই ভুক্তভোগীদের মধ্যে থাকা পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার দুই অভিবাসী শ্রমিক পরিবারের বিরুদ্ধে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের ‘নির্বাসন আদেশ’ খারিজ করে দিয়েছে আদালত। এ সময় আটক ব্যক্তিদের ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ হিসেবে প্রমাণ করতে চাওয়ায় কেন্দ্র সরকারের মানবাধিকার বিরোধী পদক্ষেপের কড়া সমালোচনাও করেন বিচারকেরা।
এর আগে, এক শুনানিতে কীভাবে এবং কোন জায়গা থেকে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করা হয়েছিল তা হলফনামায় উল্লেখ করে ব্যাখ্যা দিতে কেন্দ্র সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। এরপর কেন্দ্র সেই হলফনামা জমা দিলে ভুক্তভোগীদের পরিবারের দেওয়া তথ্য-প্রমাণ (ভারতীয় নাগরিকত্ব, আধার কার্ড, জমির দলিল) যাচাই বাছাই করে তাদের ‘ভারতীয় নাগরিক’ হিসেবেই উল্লেখ করে হাইকোর্ট।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘আমরা ওই ব্যক্তিদের ভারতে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছি। তাদের ফিরিয়ে আনতে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সেটিও আমরা উল্লেখ করেছি। প্রশাসনকে চার সপ্তাহের সময় দেওয়া হয়েছে।’
মামলার শুনানিতে বলা হয়, ভারতের আইন অনুযায়ী- কাউকে ‘ঠেলে পাঠাতে’ হলে অন্তত ৩০ দিন পুলিশি হেফাজতে রেখে নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই ও তদন্ত করতে হবে। একই সময়ে আটক ব্যক্তি তার নাগরিকত্বের প্রমাণ যোগাড় করার সুযোগ পাবে। তবে অন্তঃসত্ত্বা নারী সোনালী বিবিকে আটকের মাত্র দুদিনের মাথায় বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। বিচারপতি প্রশ্ন করেন, ‘এত তাড়াহুড়ো করে কীভাবে প্রমাণ হলো, তারা বাংলাদেশি?’
আদালত কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলে, ‘ভুক্তভোগীরা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণিত এবং তাদের ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারের। কেবল বাংলা ভাষাভাষী হওয়ায় কাউকে “বাংলাদেশি” হিসেবে চিহ্নিত করা আইনসঙ্গত নয়।’
এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ধীতর গ্রামের বাসিন্দা সোনালী চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে স্বামীর সঙ্গে ইটভাটায় কাজ করছিলেন। তাদের আধার কার্ড, রেশন কার্ড, জমির কাগজসহ সব বৈধ নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় পুলিশ ‘বাংলাভাষী’ হওয়ার কারণে গত ২০ জুন তাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ দাবি করে আটক করে।

এরপর কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই সোনালী ও তার স্বামীকে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরি ফোর্স (বিএসএফ) সদস্যরা বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করে।
অন্তঃসত্ত্বা সোনালী গর্ভের শিশুকে নিয়েই বন-জঙ্গল পেরিয়ে নদী সাঁতরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। চিকিৎসা, পুষ্টি ও বিশ্রাম না পেয়ে তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হলে ওই দম্পতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি গ্রামে বাসা ভাড়া নিতে বাধ্য হন। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ তাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আটক করে।
এ বিষয়ে সোনালীর পরিবার কলকাতা আদালতে মামলা করে সেই অভিযোগপত্রের কপি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়। সোনালীর নাগরিকত্ব প্রমাণের ‘হেবিয়াস কর্পাস’ মামলা শুনতে সুপ্রিম কোর্ট ২৯ আগস্ট কলকাতা হাইকোর্টকে নির্দেশ দেয়।
এদিকে মামলার রায় কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়ায় তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সরকারের আইনজীবীরা। তাদের দাবি, এ ঘটনা দিল্লির। কাজেই এতে কলকাতা হাইকোর্টের রায় দেওয়ার এখতিয়ার নেই। পাশাপাশি তারা অভিযোগ করেন, ভুক্তভোগীরা হলফনামায় স্পষ্ট করে প্রমাণ দেননি যে তারা ‘বাংলাদেশি’ নন।


