ভাওয়ালের ঐতিহ্যবাহী শাল-গজারি বনের বুক চিরে চলে যাওয়া ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এখন যেন এক টুকরো বাগান। গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর থেকে শ্রীপুরের মাওনা হয়ে ময়মনসিংহের দিকে তাকালে চোখে পড়ে বর্ণিল ফুলের সমারোহ। ডিভাইডারের মাঝে লাগানো হরেক রকমের ফুল আর পাতাবাহার গাছ দূর করে দিচ্ছে চলন্ত পথের একঘেয়েমি।
গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া, চান্দনা চৌরাস্তা, শ্রীপুরের মাওনা, গড়গড়িয়া নতুন বাজার ও নয়নপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মহাসড়কের ডিভাইডারে এখন নানা রঙের ফুলের রাজত্ব। সড়কের মাঝে ফুটে থাকা সাদা, গোলাপি ও লালচে ফুলের দৃশ্য পথচারীদের এক রঙিন রাজ্যে স্বাগত জানাচ্ছে। বাসের জানালা দিয়ে অনেক যাত্রী এই মুগ্ধকর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছেন। কেউ আবার গাড়ি থামিয়ে ফুলের সাথে ছবি তুলছেন, কেউবা ভিডিও করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের মাঝখানের ডিভাইডারে কয়েক হাজার গাছের চারা লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নীল কাঞ্চন, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কামিনী, টগর, পলাশ, জারুল, রক্তকরবী, কদম, কাঠবাদাম, কনকচাঁপা ও অগ্নিশ্বরের মতো নানা প্রজাতির গাছ। ঋতু ভেদে ভিন্ন ভিন্ন ফুল ফোটায় একেক সময় মহাসড়কটি একেক রঙে সেজে ওঠে।
শ্রীপুর থেকে আসা শিক্ষার্থী সুমন মিয়া জানান, ফেসবুকে ভিডিও দেখে তিনি সরাসরি এটি দেখতে এসেছেন। ভিডিওর চাইতে বাস্তবে এটি তার কাছে আরও বেশি সুন্দর মনে হয়েছে। আরেক দর্শনার্থী সাবিনা আক্তার বলেন, তার মনে হচ্ছে যেন তিনি বিদেশের কোনো সড়কে দাঁড়িয়ে আছেন। তবে পুরো মহাসড়কজুড়েই এমন দৃশ্য থাকলে আরও ভালো লাগত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অবশ্য এই নান্দনিক সৌন্দর্যের মোহে পড়ে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। অনেক উৎসুক মানুষ ডিভাইডারের ওপর উঠে ছবি তুলছেন কিংবা সড়কের মাঝখানে বসে পোজ দিচ্ছেন। দ্রুতগামী যানবাহনের সামনে এমন আচরণ যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এছাড়া কিছু অসচেতন মানুষ ফুল ও ডাল ভেঙে ফেলায় গাছের ক্ষতি হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের মতে, মহাসড়কের এই সবুজায়ন শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, বরং বায়ুদূষণ কমাতে ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। পরিবেশবিদরা বলছেন, ডিভাইডারের এই গাছগুলো রাতের বেলা এক লেনের গাড়ির হেডলাইটের আলো সরাসরি বিপরীত লেনের চালকের চোখে পড়তে বাধা দেয়, যা সড়ক নিরাপদ করতে সাহায্য করে।
গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুহাম্মদ তারিক হাসান জানান, মহাসড়ককে দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব করতে নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এই গাছগুলো রক্ষা করা হচ্ছে।
যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝে এই মহাসড়কটি মনে প্রশান্তি জোগালেও, সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সবাইকে সমানভাবে সচেতন হতে হবে বলে মনে করেন সচেতন মহল।


