ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চোরের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন মানুষ। গ্রাম থেকে জেলা শহর, স্বস্তি নেই কোথাও। দিন-দুপুরে বিদ্যুতের তার, এসি’র কপার পাইপ, বাসা-বাড়ির জানালা, সিড়ি কোঠা, এমনকি টয়লেটের জানালার কাঁচ চুরি হয়ে যাচ্ছে।
চুরি করা এসব মালামাল বিক্রি হচ্ছে জেলার বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গারীর দোকানে। কিন্তু এসব দোকানে অভিযান বা চোর ধরতে পুলিশের উদাসীনতার অভিযোগ উঠেছে।
গত ঈদুল আজহার দু’দিন আগে সরাইল উপজেলার শাহজাদাপুর ইউনিয়নের দেওড়া গ্রামের খাদেম বাড়ির ৯টি ঘরের বিদ্যুতের সার্ভিস তার চুরি হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে দু’বার তার চুরি হয় খাদেম বাড়ি থেকে। গ্রামের খাঁ বাড়ির ৩ ঘর,পাঠান বাড়ির ৫ ঘর এবং দক্ষিন খাঁ বাড়ির দুটি ঘর থেকে গত শুক্রবার রাতে বিদ্যুতের সার্ভিস তার চুরি হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে দেওড়া বাজার থেকে ৫ দোকানের তার চুরি হয়। গ্রামের ইয়ার খান জানান, নেশাসক্তরাই রাতে এসব চুরিচামারি করে।
জেলার নবীনগর উপজেলার বড়াইল ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামেও বিদ্যুতের বিদ্যুতের সার্ভিস তার চুরির হিড়িক পড়েছে। প্রায় ২ মাসে ৩০/৩৫ বাড়ির বিদ্যুতের সার্ভিস তার চুরি হয়।
স্থানীয় সুত্র জানায়, গ্রামে দিনদুপুরে বাসাবাড়ির বিদ্যুতের সার্ভিস তার চুরি হচ্ছে। গত এই কয়েক মাসে জালশুকা মোল্লাবাড়ির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুমায়ুন, মিজানুর রহমান, মহিন, তামিম, রিজেন, বেলাল মোল্লা, ফরদি বাড়ির মোঃ আলম, খন্দকার বাড়ির নূরুজ্জামান, সিদ্দিক, ইলিয়াছ, বাচ্চু, খাঁ বাড়ির আবু, বাবু, আওলাদ আলী, রহমত আলী,শামসু মাষ্টার বাড়ির টোটন, মধ্যপাড়ার বাতেন, কাদির, জাহাঙ্গীর, হেলাল, নূরে আলম ও আউয়ালের বাড়ির বিদ্যুতের সার্ভিস তার চুরি হয়।
বড়াইল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান জানান, ৬ মাস ধরে গ্রামে তার চুরি ঘটনা বেড়েছে। এতে নেশাখোরদের হাত রয়েছে বলে তার অভিযোগ। তিনি বলেন, জালশুকা গ্রামে ৮/১০জন মাদক সেবী রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের দাতিয়ারা এলাকায় অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোরবানির ঈদের আগে ও পরে দু’বার চুরির ঘটনা ঘটে। গত ২৪শে মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের রুমের একটি এসি’র আউটডোর ইউনিটের সবকিছু খুলে নিয়ে যায় চোরেরা। অডিটরিয়ামের দুটি জানালার কাঁচও চুরি হয় সেসময়। ঈদের পর কনফারেন্স রুমের দুটি এসি চুরির জন্য খুলে ফেললেও নৈশপ্রহরী সজাগ হয়ে যাওয়ায় তা নিতে ব্যর্থ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, চুরির ঘটনা বারবার ঘটতে থাকায় তারা উদ্বিগ্ন। থানায় অভিযোগ করার পর পুলিশ এসেছিলো বলে জানান তিনি। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নিরাপত্তকর্মীকে তারা কারন দর্শাও নোটিশ দিয়েছেন।
চুরি হয়েছে জেলা পরিষদ কার্যালয়ের একটি এসি’র কপার পাইপ। পার্শ্ববর্তী পরিবার পরিকল্পনা অফিসে কয়েক মাস আগে প্রায় ৭০ হাজার টাকা মূল্যের জেনারেটরের তার এবং পানির মোটরের তার চুরি হয়।
চুরি যাওয়া তারের সংস্থান না হওয়ায় অফিসে এখন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা নেই। জেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কেন্দ্রগুলোতে প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটছে বলে জানান এক কর্মকর্তা। চোরেরা ফ্যান, দরজা-জানালা খুলে নিচ্ছে। থানায় জিডি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানোর পরও কোন প্রতিকার মিলছেনা।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার অফিসের পানির মোটর চুরি হয়েছে। শহরের ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাঠাগার চত্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া টেলিভিশন জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশনের কার্যালয়ের এসির গ্যাস পাইপ চুরি হয়। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমীর এসি’র গ্যাস পাইপও চুরি হয়। শহরের একজন এসি মেকানিক ইয়াকুব জানান, গত ১৫দিনে সে চুরি হয়ে যাওয়া ১০টি এসি’র কপার পাইপ স্থাপন করেছে।
পুনিয়াউট নয়নপুরে শরীফ মিয়ার অটো গ্যারেজ, ওয়াসিম মিয়ার মুরগির খামারের বিদ্যুতের তার চুরি হয় ঈদের পর। সদর উপজেলার সুহিলপুরে শাহজাহান মাষ্টারের বাড়ি থেকে পানির মোটর চুরি হয়। এই গ্রামে টিউবওয়েল ও টিউবওয়েলের মাথা, বিদ্যুতের তার চুরি হচ্ছে প্রতিদিন। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে থাকা জেলা জজ আদালতের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দ আমিনা ফারহিনের শহরের মৌলভীপাড়ার ভাড়া বাসায় চুরির ঘটনা ঘটে ৩০মে। চোর ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকে দুটি আলমারীর সব মালামাল নিয়ে যায়।
এছাড়া শহরের বিভিন্ন বাসা বাড়ি থেকে জানালার কাঁচ চুরি হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন এসব চুরির ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন শহরের টানবাজারের ব্যবসায়ীরা।
সরাইল উপজেলার বিশ্বরোড, সদর উপজেলার সুহিলপুর, নন্দনপুর ও সহ জেলার বিভিন্নস্থানে ভাঙ্গারীর ব্যবসা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ভাঙ্গারীর দোকানে নির্বিঘ্নে বিক্রি হচ্ছে তামার তার, এসির গাইস পাইপ, থাই গ্লাসসহ বিভিন্ন চোরাই মালামাল।
জেলায় ছিঁচকে চুরি বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেছেন পুলিশ সুপার শাহ মোঃ আবদুর রউফ। তিনি বলেন, পুলিশের অভিযানে মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাদক ব্যবসায় জড়িত এবং নেশাসক্তরা অর্থের জন্য চুরিতে লিপ্ত। প্রতিদিনই এদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ভাংগারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে কারা এসব মালামাল কেনাবেচায় জড়িত তাদের তালিকা করে অভিযান চালানো হবে।


