দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় অকাল বৃষ্টি ও বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এপ্রিল মাসের অতি বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে দিগন্তজোড়া সোনালী ধান। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল, যা দেশের মোট বোরো চাষের শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সামান্য ক্ষতিও চালের বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে চালের দাম বাড়তে পারে, চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।
বাংলাদেশে মোট ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশই আসে বোরো থেকে। গত অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ১২ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়েছিল। চলতি মৌসুমে ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা হচ্ছে। এমন অবস্থায় এবারও চালের ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে মানুষের মধ্যে ভয় বাড়ছে। এতে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে আগে থেকেই অস্থির থাকা চালের বাজার।
পানিতে ডুবেছে মাঠ, দুশ্চিন্তায় কৃষক
সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের কৃষকরা অসহায়ভাবে দেখছেন তাদের কয়েক দিনের মধ্যে কাটার উপযোগী ধান পানির নিচে হারিয়ে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কৃষক প্রশান্ত সাগর দাস তার ফসল রক্ষার লড়াইয়ের কথা জানিয়ে বলেন, যদি কয়েকদিন রোদ থাকে তবে আংশিকভাবে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে।
অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানির নিচে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। তবে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে এবং পানির তোড় বাড়তে থাকায় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিস উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মন্ডল জানান, তাদের মূল্যায়ন দল এখনো মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই হিসাবটি চূড়ান্ত নয়, ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সারা দেশে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়। সেই হিসাবে হাওরের এই ক্ষতি এক শতাংশের সামান্য নিচে হলেও আঞ্চলিকভাবে এর প্রভাব অনেক বেশি। গত মৌসুমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলা দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সরবরাহ করেছিল।
বাজার পরিস্থিতি ও ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মো. আখতারুজ্জামান খান বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে।
যদি উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয় তবে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাবে। ইতিমধ্যে বাজারে চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তারা চাল কিনে মজুত করা শুরু করতে পারেন, যা বাজারে আরও অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে।
তিনি কর্তৃপক্ষকে আগামী আমন মৌসুম নিয়ে আগাম পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়েছেন। আখতারুজ্জামান বলেন, যদি আগাম পরিকল্পনা নেওয়া না হয় তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও চাপের মুখে পড়বে। তবে আগামী আমন মৌসুম যদি ভালো হয়, তবে খাদ্য সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
তিনি আঞ্চলিক কৃষি পরিকল্পনা, শস্য বহুমুখীকরণ এবং আমন চাষের জন্য কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নদীর পানি বৃদ্ধি ও প্রতিকূল পূর্বাভাস
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। দেশের মধ্যাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে সাতটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পয়েন্টে নলজুর নদীর পানি বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এ ছাড়া সুতাং রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে সুতাং নদীর পানি ৮৩ সেন্টিমিটার এবং নেত্রকোনা পয়েন্টে মগড়া নদীর পানি বিপদসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।
হাওর অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরমা-কুশিয়ারা এবং ধানু-বাউলাই নদী ব্যবস্থার পানিও ক্রমাগত বাড়ছে। আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় আগামী তিন দিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এক সপ্তাহের মধ্যে ১৫০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আশঙ্কা করছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শেষ পর্যন্ত ৭৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমি তলিয়ে যেতে পারে।
উৎপাদন, চাহিদা ও আমদানির চিত্র
গত অর্থবছরে ৪ কোটি ৮৮ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমি থেকে ২ কোটি ১৩ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়েছিল। সেই হিসেবে শুণ্য দশমিক ৯৩ শতাংশ ফসলের ক্ষতি মানে প্রায় এক লাখ ৯৫ হাজার টন ধানের ঘাটতি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য দেশে চালের চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন।
বিপরীতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৭৭ লাখ টন। পরবর্তী বছরের জন্য চাহিদা আরও বেড়ে ৩ কোটি ৯১ লাখ টন হতে পারে, যা চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেবে।
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকার চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করে আসলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শুধুমাত্র এই চলতি অর্থবছরেই দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ১২ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়েছে।
ভবিষ্যৎ করণীয়
মাঠ পর্যায়ে যখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে, তখন বিশেষজ্ঞরা দুর্যোগ মোকাবিলা ও খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশলের ওপর জোর দিচ্ছেন। সামনে আমন মৌসুম আসছে, তাই জলবায়ুর এই পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে কৃষিনীতি প্রণয়ন করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
প্রশান্ত সাগর দাসের মতো কৃষকদের জন্য এখন প্রধান চিন্তার বিষয় হলো সময় ও পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা। প্রতিটি রোদেলা দিন তাদের জন্য ফসল রক্ষার আশা নিয়ে আসে, আর প্রতিটি বাঁধ ভাঙার শব্দ তৈরি করে তাদের কয়েক মাসের পরিশ্রম ধুয়ে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা।


