এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতি সাত জনের একজন জীবদ্দশায় তাদের প্রাপ্য অবসরোত্তর সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছেন না।
বয়সের ভার আর রোগে ক্লান্ত শ্রান্ত বয়োজ্যেষ্ঠ এসব ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে এই সুবিধা পেতে যুদ্ধ শুরু করতে হচ্ছে তাদের উত্তরাধিকারদের।
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে চিকিৎসার জন্যও অনেকে প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না। অথচ অবসর জীবন তাদের আরাম আয়েশে কাটানোর কথা। অবসরোত্তর সুবিধা একারণেই দেওয়া হয়ে থাকে।
রাজধানীর ইস্কাটনে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে’ গেলেই দেখা মেলে এমন অনেক শিক্ষকদের। যারা চাকরিতে থাকা অবস্থায় নিজের জমানো টাকা ফেরত পেতে অনুনয় বিনয় করেন। কিন্তু ফিরতে হয় হতাশ আর ক্ষুব্ধ হয়ে।
শিক্ষক কর্মচারীদের দুই ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা। এক. কল্যাণ তহবিলের টাকা, দুই. অবসর সুবিধা। ২৫ বছরের চাকরি জীবন শেষ করলে সবশেষ বেতন স্কেলের ৭৫ গুণ টাকা অবসর সুবিধা এবং স্কেলের ২৫ গুণ টাকা কল্যাণ তহবিল থেকে প্রাপ্য।
চাকরি জীবনের শুরু থেকে মূল বেতনের ৬ শতাংশ টাকা অবসর তহবিল ও ৪ শতাংশ টাকা কল্যাণ তহবিলে জমান তারা। কিন্তু যে পরিমাণ টাকা জমা হয়, তা দিয়ে তাদের প্রাপ্য টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে তাদের অন্তত বছর চারেক ধর্না দিতে হয় বোর্ডে।
সরকার মাঝেমধ্যে কিছু টাকা অনুদান হিসেবে বোর্ডে দেয়, যা অবসরপ্রাপ্ত সকলের জন্য পর্যাপ্ত না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার বছরে অতিরিক্ত সাতশ কোটি টাকা অনুদান দিলে তা ঐ বছরের সবাইকে প্রাপ্য টাকা দেওয়া যাবে, যদিও অতীতের বছরগুলোর ঘাটতি থেকে যাবে।
অবসর সুবিধা বোর্ডের পরিচালক মো. জাফর আহম্মদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি ১৫ শতাংশের মতো শিক্ষক কর্মচারী তাদের অবসরের টাকা পাওয়ার আগেই মারা যান। সেই টাকা পরে তাদের উত্তরাধিকাররা উত্তোলন করেন।’
সারা দেশে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ। প্রতিবছর গড়ে অবসরে যান প্রায় ১৫ হাজার জন। অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে তাদের পাওনা মেটাতে প্রয়োজন অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা।
ক্যান্সারের চিকিৎসা হবে না এক শিক্ষকের?
গত মঙ্গলবার বোর্ড সচিবের কক্ষে প্রবেশ করলেন দুই ব্যক্তি। তাদের একজন শিক্ষক হিসেবে সদ্য অবসর নিয়েছেন চট্টগ্রামের একটি কলেজ থেকে; মস্তিস্কে ক্যান্সারে আক্রান্ত।
শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল, ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না, ফলে তার নামটাও জানা গেল না। সঙ্গে থাকা ব্যক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জাফর আহম্মদের কাছে হস্তান্তর করলেন। জরুরি উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত অবসরের টাকাটা দিতে অনুরোধ করেন।
কিন্তু কাগজপত্র দেখে জাফর আহম্মদ তাকে হতাশ করলেন। জানান, ২০২৭ সালের শেষের দিকে হয়ত অবসরের টাকা পেতে পারেন। এর আগে কোনোভাবেই দেওয়া সম্ভব না।
জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা ওই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অনুনয় করতে লাগলেন। বোঝাতে চাইলেন, চিকিৎসা করাটা জরুরি। নইলে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকাটাই অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে।
তখন জাফর আহম্মদ তাকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন, ‘সরকারের কাছে বিশেষ তহবিল গঠনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। কয়েকমাস পর আরেকবার খোঁজ নিয়েন, যদি তহবিল পাওয়া যায় হয়তো ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু তহবিল না পাওয়া গেলে সিরিয়াল ব্রেক করে কিছু করা যাবে না।’
এমন একজন মানুষের জন্য কি আসলেই কিছু করার নেই? টাইমস অব বাংলাদেশের প্রশ্নে অবসর সুবিধা বোর্ডের পরিচালক বলেন, শুধু ২০২২ সালে অবসর নেওয়া প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে অন্তত ৩ হাজার ব্যক্তি অসুস্থতাজনিত মেডিক্যাল সার্টিফিকেট জমা দিয়ে রেখেছেন। এরকম মানবেতর অবস্থা নিয়ে প্রতিদিন দুয়েকজন অসুস্থ শিক্ষক-কর্মচারীরা আসেন।’
তবে পরিচালক যে তথ্যটি বলেননি সেটি হলো, কয়েক বছর আগে অবসর বোর্ডের সিদ্ধান্ত আছে, ক্যান্সার আক্রান্ত এবং হার্টের বাইপাস অথবা কিডনির অপারেশনের রোগীর ক্ষেত্রে সিরিয়াল অনুসরণ করতে হবে না। তাদের টাকাটা পাস করা হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
হজ্বযাত্রী এবং মুক্তিযোদ্ধার আবেদন নিষ্পত্তিতেও একইভাবে দ্রুত পাওনা টাকা দেওয়ার বিধান আছে।
সেই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে তাহলে কেন এই শিক্ষকের টাকা দেওয়া যাবে না- এই প্রশ্নে তিনি টাইমসকে বলেন, ‘৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের আগে এটা করা হতো। কিন্তু অসুস্থতার ভুয়া কাগজ তৈরি করে অনেকে সিরিয়াল ভেঙে আগে টাকা তোলার চেষ্টা করত। প্রকৃত অসুস্থতার চাইতে ভুয়া অসুস্থতাই বেশি, এত যাচাই করাও আসলে আমাদের পক্ষে কঠিন। এ কারণে এটা এখন বন্ধ আছে।’
বোর্ডের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা টাইমসকে জানান, ‘এই বোর্ডে আমলাতান্ত্রিক কঠোর মানসিকতা নিয়ে কাজ করলে হবে না। এমন ভাবনা থাকলে অসহায় শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য কিছু করতে পারবে না। এখানে ঘাটতি আছে সত্য, তবে সংবেদনশীলতার সঙ্গে কাজ করলে যাদের বেশি প্রয়োজন, তাদের টাকা আগে দেওয়ার সুযোগ আছে।’
নিয়মের বেড়াজালে বিপন্ন মানবিকতা
গত সোমবার দুপুরেও কথা হয় অবসর সুবিধা বোর্ডের বারান্দায় ঢাকার ধামরাই উপজেলার শৈলান সুরমা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত দপ্তরি আব্দুল কুদ্দুসের সঙ্গে। কিডনির সমস্যা, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছিলেন না। একজন সহায়তাকারীকে সঙ্গে নিয়ে অবসরের প্রাপ্য টাকার খোঁজ নিতে এসেছেন।
৪১ বছরের চাকরিজীবন শেষে ২০২২ সালে অবসর নিয়েছেন কুদ্দুস। বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রী, স্বামী পরিত্যক্তা কন্যা ও স্কুলপড়ুয়া নাতনির খরচ জোগাতে ভরসা হতে পারত এই টাকাটা।
টাইমসকে কুদ্দুস বলেন, ‘চার বছরের বেশি সময় অপেক্ষার পর গত মাসে কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা তুলতে পেরেছি। কিন্তু অবসর সুবিধা বোর্ডের টাকা কবে পাব জানি না। আজ অফিস থেকে বলল- কয়েক মাস পর খোঁজ নিতে।’
ত্রিশ বছর শিক্ষকতা শেষে এখন অবসর জীবনযাপন করছেন কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার আলহাজ্ব কে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. হাবিবুল্লাহ। অবসর নেওয়ার পর পাঁচ বছর চলে গেলেও এখনো পেনশনের টাকা পাননি।
তবে কবে নাগাদ অবসরের টাকা পাওয়া যেতে পারে সেই খোঁজ নিতে গত সোমবার রাজধানীর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে এসেছিলেন তিনি।
‘এর আগেও কয়েকবার এসে কাগজপত্র আপডেট করেছি। অনেকদিন তো হয়ে গেলো। এখনও যদি টাকা পাই, পরিবারের জন্য কাজে লাগতো’ বলেন তিনি।
সমাধান যেখানে
২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অবসরে যাওয়া এক লাখ ১৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী আবেদন বোর্ডে পড়ে আছে। এদের মধ্যে ৭০ হাজার আবেদন পড়ে আছে অবসর বোর্ডে, ৪৫ হাজার আবেদন আটকা কল্যাণ ট্রাস্টে।
বোর্ড পরিচালক মো. জাফর আহম্মদ টাইমসকে বলেন, ‘সরকারিভাবে বরাদ্দের ঘাটতি থাকায় এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২২ সালের প্রথম তিনমাসের মধ্যে যারা অবসরে গিয়েছেন, আমরা এখন তাদের পাওনা টাকা দেওয়ার জন্য কাজ শুরু করেছি।’
কাগজপত্রে সমস্যাসহ কিছু ব্যতিক্রম ঘটনা ছাড়া ২০২১ সাল পর্যন্ত যারা অবসরে গিয়েছেন, ইতোমধ্যে পাওনা টাকা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এমপিওভুক্ত প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা। প্রতিবছর গড়ে অবসরে যান প্রায় ১৫ হাজার জন। অবসর সুবিধা মেটাতে প্রয়োজন ১৫০০ কোটি টাকা।
সরকার থেকে প্রতি বছর সুনির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক না এলেও অতীতে কয়েকজন বোর্ড সচিবের চেষ্টায় একটি বড় অঙ্কের তহবিলের ব্যবস্থা করা গেছে। সেই টাকা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত করে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে আসা লভ্যাংশ এবং প্রতি মাসে শিক্ষক কর্মচারীদের জমানো টাকা মিলিয়ে এক হাজার কোটি টাকার মতো সংস্থান হয়। ঘাটতি থাকে পাঁচশ কোটি টাকার মতো।
অবসর বোর্ডে প্রতি বছর ঘাটতি থাকে ৩৬০ থেকে ৩৮৪ কোটি টাকা। এজন্যই অবসর সুবিধা পেতে চার বছরের একটি জট তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে প্রতি বছর ঘাটতি থাকে দেড়শ কোটি টাকার কিছু বেশি। এই তহবিল থেকে পাওনা পেতে তিন থেকে সাড়ে বছর সময় লাগছে।
কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব মো. হুমায়ুন কবির সেখ টাইমসকে বলেন, ‘২০২২ সালের ডিসেম্বরে যারা অবসর নিয়েছেন, এখন তাদের টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে। চার থেকে পাঁচ মাসের টাকা দেওয়ার মতো অর্থ আছে।’
অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্টের তথ্য মতে, সব মিলিয়ে দুই তহবিলে ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকার যদি এককালীন বা কয়েক বছরে এই টাকা বরাদ্দ দেয়, তাহলে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সবার পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
এরপর প্রতিবছর এজন্য বাজেটে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরের সঙ্গে সঙ্গেই সব পাওনা পরিশোধ করা যাবে।


