দিনটি ছিল ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। জাতির ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। তবে শোকের এই দিনে জ্ঞানের আলো খুঁজতে মানুষ ছুটে এসেছে বইয়ের পাতায়। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে পাঠকরা ভিড় জমিয়েছেন বাংলা একাডেমি চত্বরে।
চলমান বিজয় বইমেলার পঞ্চম দিনটি ছিল তাই অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে আলাদা। ছুটির দিন ও বিশেষ দিবস হওয়ায় মেলা প্রাঙ্গণ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বইপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো একাডেমি চত্বর।
মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের প্রতি বিশেষ ঝোঁক শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে মেলায় আসা পাঠকদের মানসিকতায় ছিল দেশপ্রেমের স্পষ্ট ছাপ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের পাঠকদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার আগ্রহ ছিল প্রবল। মেলায় আগত দর্শনার্থীরা সবচেয়ে বেশি খোঁজ করেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের জীবনী, তাদের অবদান এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসভিত্তিক বইগুলো।
বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখা গেছে, পাঠকেরা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ বই হাতে তুলে নিচ্ছেন। প্রকাশকদের মুখেও ছিল স্বস্তির হাসি। তারা জানিয়েছেন, মেলার আগের চার দিনের তুলনায় আজ পাঠক উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। লোকসমাগম বেশি থাকায় বই বিক্রিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দিনের শেষে বিক্রির পরিমাণ সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
ডিজিটাল প্রচারণায় নতুনত্ব
বিজয় বইমেলাকে কেন্দ্র করে ঢাকাজুড়ে চলছে ব্যাপক প্রচারণা। বাংলা একাডেমি চত্বরসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে শোভা পাচ্ছে অসংখ্য ব্যানার ও ফেস্টুন। তবে এবারের প্রচারণায় প্রযুক্তির ব্যবহার যোগ করেছে নতুন মাত্রা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইমেলার আমেজ ছড়িয়ে দিতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ডিজিটাল উদ্যোগ।
ফেসবুকে পাঠকদের ছবি শেয়ার করার জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি ‘ডিজিটাল ফটোফ্রেম জেনারেটর’। পাঠকরা খুব সহজেই নির্দিষ্ট লিঙ্কে প্রবেশ করে নিজেদের ছবি দিয়ে বিজয় বইমেলার আকর্ষণীয় কার্ড তৈরি করতে পারছেন। মেলা প্রাঙ্গণ ও অনলাইনের এই মেলবন্ধন ইতোমধ্যে পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

সুরের মূর্ছনায় স্মৃতিচারণ
প্রতিদিনের নিয়মে আজও দুপুর আড়াইটায় মেলার গেট খুলে দেওয়া হয়। তবে সন্ধ্যার আয়োজন ছিল আবেগঘন। মেলা প্রাঙ্গণের নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় মঞ্চে ওঠে সংগীত দল ‘জলতরঙ্গ’। তারা পরিবেশন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালজয়ী সব গান। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে’–এই গানের সুরে পুরো মেলা প্রাঙ্গণে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। দেশাত্মবোধক গান ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই উদ্দীপনামূলক সংগীত পরিবেশনা দর্শক-শ্রোতাদের আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্য সবাই ফিরে গিয়েছিলেন একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে।
সোমবারের শিশুতোষ আয়োজন
বিজয় বইমেলার সাংস্কৃতিক পর্ব প্রতিদিনই নতুন নতুন আয়োজন নিয়ে আসছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যায় মেলা প্রাঙ্গণ মুখর হবে শিশুদের কলকাকলিতে। সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা থেকে মঞ্চে থাকবে শিশুদের বিশেষ পরিবেশনা।
সোমবারের অনুষ্ঠানে যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করবে ‘সুর নিবেদন সংগীত একাডেমি”এর শিশুশিল্পীরা। এ ছাড়া দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেবে শিশুদের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলা আমার’। পাশাপাশি একক সংগীত পরিবেশন করবেন বিশিষ্ট শিল্পী লায়েকা বশীর। তিনি শোনাবেন নজরুল গীতি ও দেশের গান।
বই, সংস্কৃতি আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এই মিলনমেলা আগামী দিনগুলোতে আরও জমজমাট হবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।


