স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে শিগগির সমাধান করতে চান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগেই এ কাজটি করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে আলোচনা করেছেন তারেক রহমান। তবে প্রতিদিনই কোনো না কোনো নির্বাচনী আসনের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে তিনি টেলিফোনে কথা বলছেন কিংবা গুলশানের কার্যালয়ে ডেকে এনে তাদের অনুরোধ করে বসিয়ে দিচ্ছেন।
দলের চেয়ারম্যানের কথা শুনে অনেকেই নির্বাচন থেকে সরে পড়েছেন। আগামী নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে এসব স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মূল্যায়ন করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হচ্ছে। তবে যেসব আসনে মিত্র দলগুলোর জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেসব আসনে যেন বিএনপির কোনো বিদ্রোহী কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী না থাকে–এ জন্য শিগগিরই ওই আসনের বিএনপি নেতাদের ডাকবেন তারেক রহমান।
নেতাদের ডেকে তিনি স্পষ্ট করে বলে দেবেন, দলের মনোনীত প্রার্থী ছাড়া অন্য কেউ থাকতে পারবেন না। প্রথমে বিদ্রোহীদের বোঝানো হবে। এরপরও যদি তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেন, তখন দলীয়ভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে বিএনপি।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, যারা দলের পক্ষ থেকে মনোনীত হয়েছেন, তারা ছাড়া অন্যদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছে। অনেকেই এতে সম্মতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেকেই যোগ্য প্রার্থী। এরপরও দলের স্বার্থ বিবেচনায় তাদের নির্বাচন থেকে সরে যেতে হচ্ছে।
জানা গেছে, শরিকদের সঙ্গে ‘আসন সমঝোতার ভিত্তিতে’ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। তবে ধানের শীষ না পেয়ে শতাধিক আসনে বিএনপি নেতারা এখনো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন, যা দলটিকে অস্বস্তিতে রেখেছে।
বিএনপির লক্ষ্য, নির্বাচনে ধানের শীষ ও জোটের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করা। দলটি চায় না, তাদের কোনো নেতা অন্য কোনো ব্যানারে নির্বাচনে থাকুক। এ কারণে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনের মাঠ থেকে সরাতে নানা তৎপরতা শুরু করেছে বিএনপি। দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাদের বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে বসিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
এর সর্বশেষ প্রক্রিয়া হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন। বিশেষ করে যেসব আসন গুরুত্বপূর্ণ এবং যেখানে সমঝোতার ভিত্তিতে জোট শরিকদের আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেসব আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে থাকা দলের নেতাদের নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে ধানের শীষ বা জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি।
একই সঙ্গে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাদের মূল্যায়নের আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। বহিষ্কৃত থাকলে শিগগির বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়েও আশ্বস্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ার অভিযোগে ১০ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
দলটি মনে করছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ভোটের মাঠে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তাই দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষাই এখন বিএনপির সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে অত্যন্ত কঠিন মনে করছে দলটি। আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে কেউ নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আসন্ন নির্বাচনে শরিকদের সঙ্গে ১৭টি আসনে সমঝোতা করেছে বিএনপি। ১২টি দলের সঙ্গে হওয়া এই সমঝোতায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ছাড়া বাকিগুলো ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক। কেউ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন, আবার কেউ সংশোধিত আরপিওর কারণে নিজেদের দলীয় প্রতীকে ভোট করছেন।
বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, সিলেট-৫ আসনে জমিয়তের মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জুনায়েদ আল হাবিব, নীলফামারী-১ আসনে মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দলটির মনির হোসেন কাসেমী, যশোর-৫ আসনে জমিয়তের (অনিবন্ধিত) রশিদ বিন ওয়াক্কাস, নড়াইল-২ আসনে অনিবন্ধিত এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খান, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ এলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সৈয়দ এহসানুল হুদা, কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপির রেদোয়ান আহমদ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে আমজনতার দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক (পরে বিএনপিতে যোগদান) রেজা কিবরিয়াকে আসন ছেড়েছে বিএনপি।
তবে মাহমুদুর রহমান মান্না ঢাকা-১৮ আসনেও মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করে বগুড়া-২ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।
জোটের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রেদোয়ান আহমদ, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খান, শাহাদাত হোসেন সেলিম, এহসানুল হুদা, রেজা কিবরিয়া ও ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তবে ঢাকা-১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, পটুয়াখালী-৩, ঝিনাইদহ-৪, নড়াইল-২, যশোর-৫সহ শতাধিক আসনে এখনো বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন।
বিজয় নিশ্চিত করতে কোনো ব্যানারেই যেন বিএনপির প্রার্থীরা মাঠে না থাকেন–এটাই জোট নেতাদের চাওয়া। এ কারণেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে বিদ্রোহী প্রার্থীদের গুলশান কার্যালয়ে ডেকে কিংবা মোবাইলে কথা বলে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।


