জাতীয় সংসদে চলমান জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক জমে উঠেছে। সংসদ সদস্যরা এসব বিষয়ে নানামুখী প্রশ্ন, পয়েন্ট অব অর্ডার এবং ৭১ বিধিতে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা জবাব দিচ্ছেন। এসব জবাবের বিষয়েও নানা ধরনের প্রশ্ন তুলছেন সংসদ সদস্যরা। জ্বালানি সংকট নিয়ে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ও মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে মন্ত্রীদের উদ্দেশে নানা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন সংসদ সদস্যরা।
রোববার ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে রুমিন ফারহানা জ্বালানি সংকট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং তীব্র সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, সরকার জনগণের সঙ্গে মিথ্যাচার করছে।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই, অথচ বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাস্তায় তেলের জন্য তিন কিলোমিটার লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। চালকরা মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না। সরকারের যদি কোনো সংকটই না থাকে, তবে এই লম্বা লাইন কেন? কেন তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে?’
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সরকার মার্কেটগুলো রাত ৮টার পরিবর্তে সন্ধ্যা ৭টায় বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অদূরদর্শী। মানুষ কেনাকাটা সাধারণত সন্ধ্যার পরেই করেন। এ ছাড়া অফিস-আদালতের কর্মঘণ্টা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি এই সংসদের মাধ্যমে জানতে চাই, বর্তমানে দেশে অকটেন ও ডিজেলের প্রকৃত মজুত কতদিনের আছে? পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল কেন সরবরাহ করা হচ্ছে না? তেলের মজুতদারি কারা করছে এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা পরিষ্কার করতে হবে।
এরপরই সরকারদলীয় পক্ষ থেকে হট্টগোল শুরু হলে রুমিন ফারহানার মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘দেশের বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল এবং ব্যাংকের কাছে ঋণের পরিমাণ বিশাল আকার ধারণ করেছে। গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। এর বাইরেও ব্যাংক খাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ঋণের বোঝা রয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।’
তিনি জানান, দেশের সরকারি, বেসরকারি ও বিদ্যুৎ আমদানিসহ সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বকেয়া বিলের পরিমাণ ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি।
তিনি জানান, বকেয়া বিলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে তাদের ব্যাংক ঋণ। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯ হাজার ৩১১ দশমিক ২৬ কোটি টাকা।
পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের লিখিত প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘ভোক্তা পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার নিশ্চিত করতে এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি মজুতদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
মন্ত্রী জানান, এলপিজির নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, সারা দেশে বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নিবিড় তদারকি ও বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অধিদপ্তরের বিশেষ টিম নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এ ছাড়া এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন ‘লোয়াব’-কে নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রির বিষয়টি সমন্বয় করতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, দেশে এলপিজির চাহিদার প্রায় ৯৮ দশমিক ৬৭ শতাংশই আমদানি নির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ যেন বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’ থেকে আমদানির তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আমদানিতে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে বিইআরসিকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘জনমনে ভীতি ও অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। পাম্পে মোটরসাইকেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়া বা রং লাগানোর বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই।’
তিনি বলেন, ‘অবৈধ মজুতকারীদের ধরতে সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা করা হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, ঢাকা মহানগরীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল কার্ড’ চালু করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকদের জ্বালানি সংগ্রহের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এই উদ্যোগ সফল হলে পর্যায়ক্রমে তা দেশব্যাপী বাস্তবায়ন করা হবে।
সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের লিখিত প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না।’
তিনি জানান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, চীন, আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ওমান ও ভারত থেকে সরাসরি চুক্তির আওতায় বিপিসি ৫০ শতাংশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। অবশিষ্ট শতাংশ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আমদানি করা হয়।
তিনি জানান, সামগ্রিকভাবে মোট আমদানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ থেকে ২৩ শতাংশ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে পরিবহন করা হয়ে থাকে।
দেশে যে পরিমান গ্যাম মজুত রয়েছে তা ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘বিশ্বে চলমান বিভিন্ন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের শিল্প খাতে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের সবগুলো ইউরিয়া সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে দেশীয় সার উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে শিল্প মন্ত্রণালয়। জিটুজি চুক্তির আওতায় সৌদি আরব থেকে দুই লাখ মেট্রিক টন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এবং আন্তর্জাতিক কোটেশন পদ্ধতির মাধ্যমে আরও চার লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, সার কারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল যেমন- রক ফসফেট, ফসফরিক এসিড ও সালফারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। টেন্ডারের পাশাপাশি সরাসরি উৎপাদনকারী দেশ মরক্কো, জর্ডান, ওমান, ইউএই, চীন ও মালয়েশিয়া থেকে জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে এসব কাঁচামাল সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে।


