বাংলাদেশ এ বছর বিদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে এক বড় ধরনের রদবদলের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। বর্তমানে শূন্য থাকা অথবা শিগগির শূন্য হবে এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী মাসগুলোতে সরকার অন্তত ১০টি মিশনে নতুন দূত নিয়োগ করবে। এর পাশাপাশি আরও চারটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে দায়িত্বরত রাষ্ট্রদূতরা চলতি বছরের শেষদিকে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে, যার ফলে সেখানেও নতুন নিয়োগের প্রয়োজন পড়বে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদেশি মিশনগুলোতে প্রায় ২০টি রাষ্ট্রদূত পদে পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে এতগুলো পদ শূন্য হওয়া সরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বড় সুযোগ। এর মাধ্যমে দক্ষ কূটনীতিকদের নিয়োগ দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নতুন দূত নির্বাচনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব বিভিন্ন মিশনে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের পরিকল্পনা করছি। তবে এই প্রক্রিয়াটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ। কারণ, চূড়ান্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।’
বেশ কিছু মিশন বর্তমানে শূন্য
মার্চের শুরুতে সরকার বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রদূতকে তাদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে ফেরত ডাকার পর এই রদবদল প্রক্রিয়া গতি পায়। পর্তুগাল থেকে রাষ্ট্রদূত এম মাহফুজুল হক, পোল্যান্ড থেকে মো. ময়নুল ইসলাম, মেক্সিকো থেকে এম মুশফিকুল ফজল এবং মালদ্বীপ থেকে রাষ্ট্রদূত মো. নাজমুল ইসলামকে ঢাকায় ফেরত আনা হয়েছে।
কূটনৈতিক মহলে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার আবিদা ইসলামকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য বেশ আলোচনার সৃষ্টি করেছে। হাইকমিশনারের প্রত্যাহারের বিষয়ে তার বক্তব্য কূটনীতিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই কূটনৈতিক পদে পরিবর্তনের বিষয়ে বিতর্কের সূত্রপাত করেছে।
এই প্রত্যাহারের পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস, লেবানন ও ইন্দোনেশিয়ায় দায়িত্বরত রাষ্ট্রদূতরা সম্প্রতি অবসরে গেছেন। ইরানে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে মালয়েশিয়ায় বদলি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ডেনমার্ক ও সিঙ্গাপুরে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফলে বর্তমানে পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো, মালদ্বীপ, লেবানন, ইরান, সিঙ্গাপুর, ডেনমার্ক ও যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু মিশনে রাষ্ট্রদূতের পদ শূন্য রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই শূন্যপদগুলো পূরণে পররাষ্ট্র সার্ভিসের ভেতরেও কিছু রদবদলের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, থাইল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে নেদারল্যান্ডসে এবং শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনারকে থাইল্যান্ডে বদলি করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিশন উপপ্রধানকে শ্রীলঙ্কায় পরবর্তী দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত একজন মহাপরিচালককে ইন্দোনেশিয়ার পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে, সিঙ্গাপুরে হাইকমিশনার পদের জন্য অন্য একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নামে সিঙ্গাপুরের এগ্রিমেন্ট বা সম্মতি চাওয়া হলেও গত কয়েক মাস ধরে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের বিলম্ব সাধারণত সংশ্লিষ্ট মনোনীত ব্যক্তির বিষয়ে স্বাগতিক দেশের অনীহার ইঙ্গিত দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোতে পরিবর্তনের আভাস
বর্তমান শূন্যপদগুলো ছাড়াও এই বছরের শেষদিকে চীন, কানাডা, জাপান ও ফ্রান্সের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে নতুন দূত নিয়োগের প্রয়োজন হবে। কারণ, সেখানে দায়িত্বরত রাষ্ট্রদূতরা তাদের চাকরির মেয়াদ শেষ করতে যাচ্ছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২০২৬ সালে এই দেশগুলোতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ সূত্রের খবর অনুযায়ী, বর্তমান রাষ্ট্রদূতদের মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা খুবই কম। তবে ফ্রান্সের দূতের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে। প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বর্তমানে ইউনেসকোর নির্বাহী বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তার সেই পদের মেয়াদ আগামী বছর পর্যন্ত বহাল থাকবে। কূটনীতিকদের মতে, আন্তর্জাতিক এই দায়িত্বটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে সেই পদে বহাল রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে সরকার।
রাজনৈতিক ও পেশাদার নিয়োগের ভারসাম্য
আসন্ন এই নিয়োগগুলো রাজনৈতিক বনাম পেশাদার কূটনীতিক নিয়োগের দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আবারও উসকে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলোর মধ্যে বিদেশের মিশনে ক্যারিয়ার কূটনীতিক ও রাজনৈতিক মনোনীত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নিয়োগ দেওয়ার একটি সাধারণ চর্চা রয়েছে। সম্প্রতি শূন্য হওয়া মিশনগুলোর মধ্যে পাঁচটি—পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো, মালদ্বীপ ও লেবানন-আগে পেশাদার কর্মকর্তাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের দ্বারা পরিচালিত হতো।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ধারণা, বর্তমান সরকারও এই ধারা বজায় রাখতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিশনগুলোতে সাধারণত পররাষ্ট্র সার্ভিসের অভিজ্ঞ কূটনীতিকদেরই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, কিছু রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ মিশনে পাঠানো হতে পারে। তবে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীগুলোতে ক্যারিয়ার কূটনীতিকদেরই বিবেচনা করা উচিত যেখানে বাংলাদেশের বড় ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।
শক্তিশালী কূটনীতির সুযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল রদবদল বাংলাদেশের জন্য বিদেশে তার কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার একটি বিরল সুযোগ। যথাযথভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রদূতরা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, উন্নয়ন সহযোগিতা আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
একজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, এ বছর যেহেতু প্রায় ২০টি মিশনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে, তাই দক্ষ কূটনীতিকদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানোর এটাই সেরা সময়। সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া গেলে তা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যগুলো অর্জনে এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারে সহায়ক হবে।


