বিদায়ের সুরে তাহসান: আলো থেকে সরে যাওয়ার গল্প

বিদায়ের সুরে তাহসান: আলো থেকে সরে যাওয়ার গল্প
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের সংগীতজগতে যাদের নাম উচ্চারণ করা হয় শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে, তাদের তালিকায় আছেন তাহসান খান। আড়াই দশকের যাত্রায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য নাম—একই সঙ্গে গায়ক, গীতিকার, অভিনেতা এবং টেলিভিশন তারকা। তার গান ভর করেছে প্রেমে পড়া তরুণ-তরুণীর হৃদয়, ভাঙা সম্পর্কের নিঃসঙ্গতা কিংবা জীবনের অন্তহীন প্রশ্ন। অথচ হঠাৎ করেই মঞ্চ থেকে, এমনকি সংগীতজগৎ থেকেও বিদায়ের ঘোষণা দিলেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে চলছিল তার কনসার্ট। হাজারো দর্শক–শ্রোতার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎই মাইক্রোফোনে জানালেন, ‘এটা আমার শেষ ট্যুর। ধীরে ধীরে সংগীতজীবনের ইতি টানব।’ এই ঘোষণা যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করে উপস্থিত দর্শকদের ওপর। কেউ চিৎকার করে বলতে থাকলেন ‘না–না’, আবার কেউ অশ্রু মুছলেন চোখের কোণ থেকে।

পরের দিন সংবাদমাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করলেন, এটি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। অনেক দিন ধরেই ভেবেছেন, এবার সময় এসেছে থামার। সংক্ষেপে বললেন, ‘একটা সাধারণ জীবনের আশায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তাহসানের এ সিদ্ধান্তের পেছনে আছে ব্যক্তিগত ও শারীরিক বাস্তবতা। বছরখানেক আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার কণ্ঠনালিতে ২০১৮ সাল থেকে ‘হেটেরোটোপিয়া’ নামের একটি জটিলতা ধরা পড়েছে। এর কারণে কণ্ঠের স্বাভাবিক গঠন বদলে যাচ্ছে। গান গাওয়ার ক্ষমতা ও আগ্রহ ধীরে ধীরে কমে আসছে। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি ভক্তদের সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি কোনোদিন দেখেন কনসার্ট বা লাইভ শো কমে গেছে, বুঝবেন সমস্যাটা বেড়েছে।

তবে কেবল শারীরিক সমস্যাই নয়, মানসিক ক্লান্তিও কাজ করছে। ‘মেয়ে বড় হচ্ছে, এখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রেমের গান গাওয়া আর মানানসই লাগে না,’—মেলবোর্নের কনসার্টে তার এই কথার মধ্যে স্পষ্ট বোঝা যায় দায়িত্ববোধ আর বয়সের বাস্তবতা তাকে নতুন সিদ্ধান্তে ঠেলে দিয়েছে।

শুধু মঞ্চ নয়, ভার্চুয়াল দুনিয়া থেকেও তিনি সরে এসেছেন। প্রায় এক কোটি অনুসারীর ফেসবুক পেজ ও ৩৫ লাখ ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার থাকা সত্ত্বেও তিনি দুটি অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাকটিভেট করেছেন। কারণ হিসেবে বলেছে, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অসম্ভব টক্সিক। ভালোটুকুর চেয়ে খারাপের প্রচার এত বেশি যে অনেক দিন থেকেই বিরক্ত লাগছিল। চাই মানুষ আমাকে আস্তে আস্তে ভুলে যাক।’

তিনি জানিয়েছেন, তিনটি নতুন গান রেকর্ড করা আছে। তবে সেগুলো আর প্রকাশ করবেন না। শুধু ‘পোরসেলিনা তাহসান’স প্লেলিস্ট’-এর একটি গানই হয়তো শেষবারের মতো প্রকাশিত হবে। এরপর চূড়ান্তভাবে সংগীতজীবনের ইতি।

আরও পড়ুন

ভক্তরা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতে পারছেন না এই বিদায়। তাহসান অবশ্য তাদের উদ্দেশে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, ‘এত অসাধারণ জীবন আমাকে এ দেশের গানপ্রেমী মানুষ উপহার দিয়েছেন। ২৫ বছরে এত এত গান মানুষ নিজের করে নিয়েছেন, তারপর আর কী অপ্রাপ্তি থাকতে পারে? শুধুই কৃতজ্ঞতায় ভরা জীবন।’

১৯৯৮ সালে জন কবির, জাহান ও টনির হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় ব্যান্ড ‘ব্ল্যাক’-এর। পরে যোগ দেন তাহসান ও মিরাজ। ২০০২ সালে ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘আমার পৃথিবী’ প্রকাশ পেলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। এখান থেকেই শুরু হয় তাহসানের উত্থান।

এরপর একক শিল্পী হিসেবে, ‘তাহসান অ্যান্ড দ্য সুফিজ’ এবং পরে ‘তাহসান অ্যান্ড দ্য ব্যান্ড’-এর হয়ে গেয়েছেন অসংখ্য হিট গান। তার গান কাঁদিয়েছে ভালোবাসায় ভাঙা মন, আবার দিয়েছে সাহস ও সান্ত্বনা। নাটক ও চলচ্চিত্রেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রভাবশালী মুখ।

তাহসান বললেন, ‘সূর্যের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় প্রস্থান শ্রেয়, এই বিশ্বাসে আমি বিশ্বাসী।’ জনপ্রিয়তার চূড়ায় দাঁড়িয়েই তাই তিনি সরে যাচ্ছেন। নিজের কথায়, ‘মঞ্চে বা মঞ্চের বাইরে যতটুকু দেওয়ার দিয়েছি। আর কিছু দেওয়ার নেই। যে ভালোবাসা পেয়েছি, তাতেই বেঁচে থাকতে পারব।’

তার মতে, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি দায়িত্বই এখন অগ্রাধিকার। ‘পাবলিক ফিগার হিসেবে বেঁচে থাকার ভারটা অসম্ভব বেশি। তা আর নিতে চাই না।’

তাহসান নিজের মতো করে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে চান। তবে বাংলা গানপ্রেমীরা জানেন, তার সুরের স্মৃতি থেকে যাবে আরও বহুদিন। আর সেই স্মৃতিই হবে তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad