জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতেও কুষ্টিয়ায় পুলিশের গুলিতে নিহতদের পরিবার বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে। স্বামী, সন্তান ও বাবাকে হারানোর বেদনা বয়ে চলা এসব পরিবারের দাবি, হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে জুলাই সনদ।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই কুষ্টিয়া শহরের কাস্টম মোড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছাত্রলীগ হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ১৮ জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর তৎকালীন পুলিশ টিয়ারশেল ও গুলিবর্ষণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের থানা মোড় ও ছয়রাস্তার মোড় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে কিশোর আবদুল্লাহসহ আটজন নিহত হন। আহত হন শতাধিক ছাত্র-জনতা।
ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শেষ হয়নি। নিহতদের স্বজনরা বলছেন, প্রিয়জনকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে হত্যাকারীদের বিচার না হলে তাদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন হবে না।
শহীদ ইউসুফের স্ত্রী ফাতেমা বলেন, ‘আমার স্বামী দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু দুই বছর পার হলেও আমরা বিচার পাইনি। যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই।’
ইউসুফের মেয়ে সীমা বলেন, ‘বাবা হারানোর কষ্ট শুধু বাবা হারানো মানুষই বুঝতে পারে। সরকার আমাদের মতো শহীদ পরিবারের কষ্ট বুঝুক। আমাদের পাশে দাঁড়াক। শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করুক।’
একই দাবি জানিয়েছেন শহীদ সবুজ, আবদুল্লাহ ও সুরুজ আলীর স্বজনরাও। তাদের অভিযোগ, নানা প্রতিশ্রুতি মিললেও বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
শহীদ সবুজের মা সেলিনা আক্তার বলেন, ‘আমার একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়েছি। মামলা করেছি, কিন্তু এখনো বিচার পাইনি। আসামিদের কেউ কেউ জামিনে বের হয়ে এসে আমাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
শহীদ আবদুল্লাহর বাবা মো. লোকমান হোসেন বলেন, ‘সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন, আমার ছেলে হত্যার দ্রুত বিচার চাই। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আমরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারি।’
আবদুল্লাহর মা বলেন, ‘আমার ছেলে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কিন্তু তার হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই। যারা গুলি করে হত্যা করেছে, তাদের ফাঁসি হোক।’
সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে ফেরা আহত জুলাই যোদ্ধারাও এখনো সেই দিনের বিভীষিকা বহন করছেন। শরীরে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়ে অনেকের কাটছে নির্ঘুম রাত। তাদের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের দুই বছর পরও প্রত্যাশিত বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি।
জুলাই যোদ্ধা সাদিক হাসান রহিদ বলেন, ‘জুলাইকে দুই লাইনে বলে শেষ করা যাবে না। যারা আন্দোলনের অংশ ছিলেন এবং যারা স্বজন হারিয়েছেন, তারাই এর গভীরতা অনুভব করতে পারবেন। শহীদদের হত্যার বিচার দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। জুলাইয়ের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।’
জুলাই-২৪ শহীদ সোসাইটি জেলার সভাপতি ও শহীদ বাবলু ফারাজির ছেলে সুজন মাহমুদ বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন তখনই হবে, যখন হত্যার বিচার নিশ্চিত হবে। শহীদ পরিবার ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন স্থানে শহীদদের স্মরণে নানা কর্মসূচি পালিত হলেও স্বজনদের প্রশ্ন, আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? কবে হবে হত্যাকারীদের বিচার? কবে বাস্তবায়ন হবে জুলাই সনদ?


