চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে যে রণক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছিল, তার রেশ কাটেনি সকালেও।
শুক্রবার সকাল থেকে বাকলিয়ার তুলাতুলি ও চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায় বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি। মোড়ে মোড়ে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, এপিবিএন ও র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য। এলাকাবাসীর চোখেমুখে যেমন রয়েছে আতঙ্ক, তেমনি রয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ঘৃণা।
বৃহস্পতিবার বিকালে বাকলিয়া থানাধীন চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকার ‘বিসমিল্লাহ ভবনের’ সিঁড়িঘরে চার বছরের এক শিশুকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। শিশুটির বাবা রিকশাচালক এবং মা একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত। তারা দুজনেই কাজের সন্ধানে বাইরে থাকায় শিশুটি বাড়িতে একা ছিল, সেই সুযোগেই পাশের একটি দোকানের কর্মচারী মনির (৩২) তাকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে।
এই খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত মনিরকে একটি মাদ্রাসা ভবনে আটকে রেখে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উত্তেজিত জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে এবং অভিযুক্তকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। প্রায় ছয় ঘণ্টা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় ওই ভবনের ভেতরে।
একপর্যায়ে রাত সোয়া ১০টার দিকে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুলিশ কৌশলে অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এতে জনতা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বাকলিয়া এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুড়তে হয়। এই সংঘর্ষে পুলিশ, বিক্ষোভকারী এবং সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
বর্তমানে নির্যাতনের শিকার শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন রয়েছে। শিশুটির নানী জানিয়েছেন, তার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতির দিকে হলেও শিশুটি এখনও প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার নাতনিকে অনেক আদর করে বড় করেছি। এই জঘন্য ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর বিচার না হলে এ দেশে কোনো শিশু নিরাপদ থাকবে না। এভাবে চলতে থাকলে কোন মা-বাবাই তার শিশু সন্তানকে রেখে কাজের সন্ধানে যেতে পারবে না। এলাকাটি আগে এমন ছিল না, এখন খুব খারাপ হয়ে গেছে।’
মূলত মা-বাবা দুজনেই কর্মব্যস্ত থাকায় শিশুটি বেশিরভাগ সময় নানীর কাছেই থাকত।
পুলিশের হাতে আটক হওয়া মনির হোসেন বিবাহিত এবং তার নিজেরও দুটি সন্তান রয়েছে। আটকের পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে মনিরকে তার অপরাধ স্বীকার করতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার দ্রুত না হওয়ার কারণেই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বাকলিয়াবাসীর দাবি- অভিযুক্ত মনিরের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাঁসি নিশ্চিত করা।
ঘটনার রাতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। তারা জানিয়েছেন, ফেসবুক লাইভ করার সময় পুলিশের গুলিতে একজনের কোমরে এবং আরেকজনের হাত ও পায়ে আঘাত লাগে। বর্তমানে তারা চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি-দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া জানান, পরিস্থিতি এখন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযুক্তকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


