জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) কাটানো বন্দিজীবনের বর্ণনা দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। তার দাবি, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে গুম থাকা অবস্থায় তাকে এমন স্থানে রাখা হয়েছিল যেখানে ছারপোকার কামড়ে রক্তাক্ত হতে হতো। সেই রক্তাক্ত কাপড় নিয়েই তাকে নামাজ আদায় করতে হতো, চাইলেও নামাজের জন্য পরিস্কার কাপড় দেওয়া হতো না।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে প্রসিকিউশনের তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।
আব্দুল্লাহিল আমান আযমী একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৯০ বছরের দণ্ড মাথায় নিয়ে হাসপাতালে মারা যাওয়া জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আজমের ছেলে।
জবানবন্দিতে আযমী বলেন, ‘ঘুমানোর জন্য দেওয়া তোষাকে শত শত ছারপোকা ছিল। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে লুঙ্গি ছিঁড়ে গিয়েছিল। ছেঁড়া জায়গায় সেলাই করতে করতে দর্জিও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য নিজেই হাতে সেলাইয়ের জন্য সুঁই–সুতা চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা দেননি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া জায়গায় গিট্টু দিয়ে ব্যবহার করতে হয়েছিল।’
জেআইসিতে সংঘটিত গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আসামির তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তা।
এর আগে ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। সোমবার জবানবন্দি নেওয়া শেষে জেরার জন্য শুনানি ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
এর আগে রোববারও আযমী নিজের জবানবন্দিতে নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন।
তার দাবি, গুমজীবনে দুই হাজার ৯০৮ দিন আকাশ দেখেননি।
তিনি বলেন, ‘এ সময়ে আমি চাঁদ–সূর্য দেখিনি। মেঘ–বৃষ্টি কিংবা গাছ–মাটি দেখিনি। অমানুষিক নানা নির্যাতনের মধ্য দিয়ে আমাকে জীবন কাটাতে হয়েছে।’
৬৭ বছর বয়সী আযমী ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।
তার দাবি, ২০০৯ সালের ২৪ জুন আওয়ামী লীগ সরকার তাকে কোনো অভিযোগ, তদন্ত বা বিচার ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করে এবং পেনশনসহ সব সুবিধা বাতিল করে দেয়। একই সঙ্গে তার সেনানিবাসে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীর প্রচলিত রীতি ও আইন ভঙ্গ করে নজিরবিহীনভাবে নেওয়া হয়েছিল।’
এর পরবর্তী সাত বছর দুই মাস তিনি গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি ও হয়রানির মধ্যে ছিলেন বলে দাবি করেন আযমী।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাতে ঢাকার বড় মগবাজারে নিজের বাসা থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে একাধিক মাইক্রোবাসে করে ৫০ থেকে ৬০ জন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি বাসায় প্রবেশ করে। পরিচয়পত্র বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চাইলেও কেউ কোনো উত্তর দেয়নি।
তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল যে শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কায় তিনি শেষ পর্যন্ত হাত এগিয়ে দিতে বাধ্য হন। তখন তার হাতে হাতকড়া পরানো হয়, চোখ বাঁধা হয় এবং যমটুপি পরিয়ে তাকে গাড়িতে তোলা হয়।’
আযমীর দাবি, অপহরণকারীদের মধ্যে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল মকছুরুল নামে একজনকে শনাক্ত করেছিলেন, যাকে তিনি ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা হিসেবে চিনতেন।
তবে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি বিষয়টি প্রকাশ করেননি।
তার অভিযোগ, ওই কর্মকর্তা তার সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন এবং অশালীন ভাষায় কথা বলেন।


