বিএনপি সমর্থিত মেয়র থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী, তারপর আবার প্রত্যাবর্তন—চট্টগ্রাম দেখছে এক রাজনৈতিক কৌশলের খেলা। যে খেলায় আদর্শের চেয়ে সুবিধাবাদই মুখ্য।
‘নগরের রাজনীতিতে আবার উঠে এসেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক বিএনপি সমর্থিত মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমের নাম—তবে এবার তার এই ফেরা ঘিরে রয়েছে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক আর রাজনৈতিক চতুরতার অভিযোগ।’
তৃণমূল থেকে উঠে এসে নগরের সর্বোচ্চ পদে বসা এই নেতার রাজনৈতিক গতিপথ এখন সমালোচকদের চোখে অসংলগ্ন ও স্বার্থকেন্দ্রিক। ২০১০ সালে বিএনপির সমর্থনে ঐতিহাসিক বিজয় তাকে এক সময় বিশ্বস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তবে এরপর থেকে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সেই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।
২০১৫ সালের প্রস্থান: চাপ নাকি কৌশলগত প্রত্যাহার?
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিলের ঘটনা চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে। তখন তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মেয়র নির্বাচনের দিন হঠাৎ মনজুর আলম নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান এবং রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।
তিনি দাবি করেছিলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির চরম চাপের মুখে আমি সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছি।’
তবে তার এই সিদ্ধান্তের সময় ও প্রেক্ষাপট নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। ওই সময় বিএনপির ভেতরেও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের মতে, এই পদক্ষেপটি ছিল এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে দলের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

২০২৪ সালের নির্বাচন: গভীর হয় বৈপরীত্য
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন বিএনপি কঠোরভাবে বর্জন করলেও মনজুর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এটি সরাসরি দলের অবস্থানের পরিপন্থী ছিল। তাতে বিএনপি নেতাকর্মীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
নিজের এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ‘ডিজিএফআই আমাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল এবং নির্বাচনে লড়তে বাধ্য করেছিল। আমার পরিবারের ওপরও হুমকি ছিল।’
তবে এ ধরনের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির নীতির বিরুদ্ধে নেওয়া একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে জায়েজ করতেই এই অজুহাত দেওয়া হচ্ছে। অনেক বিএনপি সমর্থকের কাছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তার নির্বাচনে অংশগ্রহণ দলের প্রতি অবিশ্বাসের দেয়াল আরও মজবুত করেছে।
২০২৬: বিএনপির দিকে ফেরা—কৌশল না কি অনুতাপ?
২০২৬ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর মনজুর আলমকে আবারও বিএনপির বলয়ে ফেরার চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে, যা তার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
খালেদা জিয়াকে যেখানে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে সমাহিত করা হয়েছে, সেই কবরের পাশে তিনি দীর্ঘমেয়াদী কোরআন তিলাওয়াতের ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন।
মনজুর আলম বলেন, ‘খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাতের জন্য আমি ১০ বছর মেয়াদী খতম-এ-কোরআনের ব্যবস্থা করেছি।’
ব্যক্তিগত আনুগত্যের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘তিনি আমাকে বিশ্বাস করতেন এবং তার উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন।’
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা মন্তব্য করছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিখাদ আনুগত্যের চেয়ে হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক পুঁজি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আওয়ামী লীগ যোগসূত্র: অস্বীকার বনাম ধারণা
প্রতিদ্বন্দ্বী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দীর্ঘদিনের অভিযোগ মনজুর আলম স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি কখনোই আওয়ামী লীগের অংশ ছিলাম না।’
তা সত্ত্বেও, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা তার প্রতি জনমনে সংশয় জাগিয়ে রেখেছে।
শক্তি প্রদর্শন না কি রাজনৈতিক সংকেত?
গত ২৫ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সফরের সময় মনজুর আলম সিটি গেট এলাকায় এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেন। রাজনৈতিক মহলে একে তার শক্তির সুপরিকল্পিত মহড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তার সমর্থকরা একে প্রচ্ছন্ন প্রভাবের প্রমাণ হিসেবে দেখলেও সমালোচকরা একে বিএনপির ভেতর প্রাসঙ্গিক হওয়ার এক নতুন ‘ব্র্যান্ডিং’ কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সুস্পষ্ট আদর্শহীন এক নেতা?
‘বিএনপি নেতা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী, হঠাৎ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে পুনরায় জোটে ফেরা—মনজুর আলমের রাজনৈতিক সফরনামায় এমন এক ধাঁচ ফুটে উঠেছে যা অনেকের কাছে আদর্শিক দৃঢ়তার চেয়ে সুবিধাবাদী কৌশল হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।’
বারবার অবস্থান পরিবর্তন, বিতর্কিত দাবি এবং প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তার এই সর্বশেষ অবস্থান পরিবর্তন কি আসলেই আদর্শিক কোনো প্রত্যাবর্তন নাকি নিছক আরেকটি কৌশলগত চাল, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—মনজুর আলমের রাজনৈতিক পরিচয় এখন চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তার আমলনামার মতোই বিতর্কিত।


