বিয়ে মানেই আনন্দ, উৎসব আর নতুন জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের রায়হান কবিরের জীবনে সেই স্বপ্ন যেন এক দুঃস্বপ্নে রূপ নিয়েছে। ধুমধাম করে বিয়ে করে কনে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, কিন্তু বাসর ঘরে গিয়েই তার চোখ চড়কগাছ! বরের দাবি—যাকে দেখে পছন্দ করেছিলেন, বাসর রাতে তার সামনে বসে আছেন অন্য কেউ। আর এই ‘কনে বদল’ নাটক শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে আদালত পাড়ায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাসর ঘরের বদলে বর রায়হান কবিরের ঠাঁই হয়েছে জেলহাজতে।
যেভাবে ঘটনার শুরু
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের জুলাই মাসে। পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের জন্য পাত্রী খুঁজছিল পরিবার। মোতালেব নামের এক ঘটকের মাধ্যমে সন্ধান মেলে রাণীশংকৈল উপজেলার জেমিন আক্তারের। বরের পরিবারের দাবি, শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে প্রথমবার মেয়েটিকে দেখানো হয়। মেয়ে পছন্দ হওয়ায় বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়। কনে পক্ষ অনুরোধ জানায়, নতুন করে আর মেয়ে দেখার প্রয়োজন নেই, সরাসরি যেন বিয়ের আয়োজন করা হয়।
বাসর রাতে চক্ষু চড়কগাছ!
১ আগস্ট রাতে আনন্দঘন পরিবেশে দুই মাইক্রোবাস বরযাত্রী নিয়ে কনের বাড়িতে হাজির হন রায়হান। বিয়ে শেষে ভোরে নতুন বউ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে বাসর রাতে। বরের ভাগিনা বাদল হোসেন জানান, ‘বিয়ের সময় অতিরিক্ত মেকআপ থাকায় আমরা বুঝতে পারিনি। কিন্তু বাসর রাতে মুখ ধোয়ার পর মামা (রায়হান) দেখেন, এই মেয়ে সেই মেয়ে নয় যাকে চায়ের দোকানে দেখানো হয়েছিল!’
ছেলের পক্ষের অভিযোগ, ঘটক ও মেয়ের বাবা পরিকল্পিতভাবে মেয়ে বদল করে দিয়ে তাদের সাথে প্রতারণা করেছেন। এই অভিযোগে পরদিনই কনেকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় বরের পরিবার।
যৌতুক নাকি প্রতারণা? পাল্টাপাল্টি মামলা
তবে মেয়ের বাবা জিয়ারুল হকের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মতে, কোনো প্রতারণা নয় বরং যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরেই ফেঁসে গেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে কলেজে পড়ে। বরপক্ষ বাড়িতে এসেই তাকে দেখেছে। ৭০ জন বরযাত্রীর সামনে কনে বদল করা কীভাবে সম্ভব? আসলে বিয়ের পরদিন তারা ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। আমি জমি বিক্রি করে টাকা দিতে চেয়ে সময় চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা শোনেনি।’
আদালত ও বর্তমান অবস্থা
দীর্ঘদিন স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। উল্টো দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছে। গত বছরের ২৭ আগস্ট মেয়ের বাবা জিয়ারুল হক বর ও তার দুলাভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অন্যদিকে ২ সেপ্টেম্বর ছেলের পক্ষ থেকেও ঘটক ও মেয়ের বাবার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করা হয়।
এই মামলার জেরে গত সোমবার ঠাকুরগাঁও আদালত বর রায়হান কবিরের জামিন নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে মীমাংসার শর্তে তাকে জামিন দেওয়া হলেও কোনো পক্ষই আপসে রাজি হয়নি।
জনমনে চাঞ্চল্য
ঘটক মোতালেব হোসেন অবশ্য নিজের দায় এড়াতে চাইছেন। তার ভাষ্য, ‘মেয়ে দেখানো হয়েছিল মেয়ের বাড়িতেই। তারা নিজেরাই তড়িঘড়ি করে বিয়ে করেছে। পরে কী হয়েছে আমি জানি না।’
ঠাকুরগাঁও বার কাউন্সিলের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন জানান, বিষয়টি এখন বিচারাধীন। কনে বদলের এই ধোঁয়াশা কাটাতে আদালতই এখন শেষ ভরসা।
বাসর রাতে কনে বদলের এই আজব ঘটনা এখন ঠাকুরগাঁওয়ের মুখে মুখে। আসলেও কি প্রতারণা হয়েছিল, নাকি যৌতুকের দ্বন্দ্বে একটি সাজানো গল্প—সেই সত্যের সন্ধানে মুখিয়ে আছে জেলাবাসী।


