বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার ২০ দিনেও অফিস করেননি আতাউর রহমান। অন্যদিকে ভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বদলির আদেশ পেয়েও ১৫ দিন ধরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েই রয়ে গেছেন অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহিম খান। এই মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ নিয়ে চলছে রশি টানাটানি।
মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, আব্দুর রহিম তার বদলির আদেশ বাতিল হয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েই সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাবেন বলে আশা করছিলেন। অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব হিসেবে রয়ে যাওয়ায় অফিস করেননি নতুন সচিব আতাউর রহমান।
সূত্র জানায়, গত ১৭ এপ্রিল বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান মারা যাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ে সচিবের চলতি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির চাইছিলেন তাকেই সচিব করা হোক। এর পেছনে যুক্তি হলো দীর্ঘদিন ধরে রহিম খানের এই মন্ত্রণালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে।
তবে ঈদের ছুটির মধ্যে গত ২৫ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আতাউর রহমানকে বাণিজ্য সচিব পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে আবদুর রহিম খানকে ১ জুন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু তিনি এখনও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েই কাজ করছেন।
আপনি কেন কাজে যোগ দেননি- এই প্রশ্নে টাইমস অব বাংলাদেশ’কে আতাউর রহমান বলেন, ‘আমি তো জয়েন করেছি ১ জুন। তবে অফিস করিনি আর কি! মঙ্গলবার থেকে অফিস করব।’
এতদিন কেন অফিস করেননি, কোনো বাধা ছিল?- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আপনারা তো জানেনই, কাল থেকে অফিস করি, বিষয়টা ইতিবাচকভাবে দেখুন।’
বদলির পরও আব্দুর রহিম খানই বা এখনও কেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আছেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে রিলিজ করেনি সেজন্য এখনও যোগ দেইনি।’
বাণিজ্যমন্ত্রী আবদুল মুক্তাদিরকে পরপর দুই দিন ফোন করলেও তার বক্তব্য জানতে পারেনি টাইমস। তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জনপ্রশাসনে নতুন করে নিয়োগ, বদলি শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাজানো প্রশাসন বদল করে বিএনপি সরকারও নিজেদের মতো করে সাজাচ্ছে।
তবে সরকারের জনপ্রশাসনের ভেতরে নিয়োগ ও বদলি নিয়ে কর্মকর্তাদের স্নায়ুযুদ্ধ প্রকাশ্যে আসছে। এর মধ্যে এই নিয়োগ ও বদলির ঘটনাটি সামনে এলো।
বর্তমান সরকারের সময় এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রশাসনের শীর্ষ পদে নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই প্রভার খাটানোর চেষ্টা চলছে।
গত মার্চে মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের তিনটি প্রতিষ্ঠানের সচিবকে অর্থমন্ত্রীকে না জানিয়েই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান টাইমসকে বলেন, ‘বোঝা যাচ্ছে সরকারের ভেতরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এক নয়। এটি প্রমাণ করে সিভিল সার্ভিস ঠিকমতো কাজ করছে না।’
এমনটি চলতে থাকলে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করে তিনি বলেন, ‘এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে। ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথা অধস্তন কর্মকর্তারা শুনবেন না।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বদলি হওয়া আবদুর রহিম খান ১৫তম প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র থেকে বাণিজ্যে সচিব করে পাঠানো আতাউর রহমান অর্থনীতি ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আওয়াল মজুমদার বলছেন, ‘এর মানে হলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কোনো কর্মকর্তাকে পদায়ন করলে সেটা কর্মকর্তারা মেনে চলতে বাধ্য হবে। কিন্তু এ ঘটনায় সেটা দেখা যায়নি।’
এই পদোন্নতি ও বদলি নিয়ে রীতি ভঙ্গ হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘জনপ্রশাসনে প্রথা হলো কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে কনিষ্ঠ কর্মকর্তাকে পদায়ন করতে হলে আগে জ্যেষ্ঠকে অন্য কোনো জায়গায় পদায়ন করা। তারপর কনিষ্ঠ কর্মকর্তাকে পদায়ন করা। সেটি হয়নি মানে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই।’
এসব ঘটনায় কারণে জনপ্রশাসনে দলাদলি বাড়ে এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতা প্রকাশ পায় জানিয়ে এই সাবেক সচিব বলেন, ‘কর্মকর্তারা যখন দেখেন সরকার তার সিদ্ধান্ত ঠিক মতো বাস্তবায়ন করতে পারছে না তখন তাদের মধ্যে সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’


