বাড়ছে সিলেটের শুঁটকির চাহিদা, যাচ্ছে বিদেশেও

বাড়ছে সিলেটের শুঁটকির চাহিদা, যাচ্ছে বিদেশেও
বিশ্বনাথ উপজেলার মাহতাবপুর গ্রামের শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রে শুকানো হচ্ছে মাছ | ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

সিলেট অঞ্চলের ভোজন রসিকদের প্রিয় খাবারের তালিকায় শুঁটকির অবস্থান অন্যতম। একসময় শুঁটকি ‘গরিবের খাবার’ নামে পরিচিত হলেও বর্তমানে বদলে গেছে শুঁটকির চাহিদা, দাম ও গুরুত্ব। এখন আর শুধু বাসাবাড়ি বা স্থানীয় রেস্তোরাঁই নয় ইউরোপ, আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিশ্বের নানা দেশে বাড়ছে শুঁটকির চাহিদা।

বিশেষ করে সিলেটি ‘সিদল’ ও ‘ছুলাপুটি’ শুঁটকির চাহিদা বেশি। বিষমুক্ত ও প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হওয়ায় সিলেটের শুঁটকি আন্তর্জাতিক বাজারেও পাচ্ছে বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা।

বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজি ইউনিয়নের মাহতাবপুর গ্রামে শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র। এটি সিলেট বিভাগে একমাত্র জায়গা, যেখানে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়।

মাহতাবপুর গ্রাম ছাড়াও সিলেট সদর, বিশ্বনাথ ও ছাতক এই তিন উপজেলার মানুষ এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত শুঁটকি নিয়ে চলে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। প্রতিদিন সেখানে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা হয়।

বিশ্বনাথ উপজেলার মাহতাবপুর গ্রামের শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রে শুকানো হচ্ছে মাছ | ছবি: টাইমস

মাহতাবপুর গ্রামের পাশেই রয়েছে মাছের আড়ত। এই মাছের আড়তকে কেন্দ্র করে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩৫টি ছোট-বড় শুঁটকি শুকানোর জন্য জায়গা ‘ডাঙ্গাইল’। বড় মাছ শুকাতে বাঁশের ডাঙ্গাইল, ছোট মাছের জন্য পৃথক উঁচু মাচা রয়েছে। বছরে প্রায় ছয় মাস এখানে চলে শুঁটকি উৎপাদন।

উৎপাদনকারীরা জানান, বছরে ছয়মাস শুঁটকি উৎপাদন করেন তারা। এ কাজে শত শত নারী-পুরুষ শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। এসব ডাঙ্গাইলে নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হয়েছে। তারা মাছ কাটা থেকে শুরু করে লবণ ছেটানো ও রোদে শুকানোর কাজও করেন।

দেশের বাজারে এখানে উৎপাদিত ছুলাপুটির শুঁটকির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আর গাজরপুটি জাতটি বিশেষভাবে জনপ্রিয় ভারতীয়দের কাছে বলেও জানান তারা।

আরও পড়ুন

মির্জারগাওঁ এলাকার শুঁটকি শ্রমিক গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘মাছ কাটার পর লবণ ছিটিয়ে দেওয়ার পর রোদে শুকানোর প্রায় চার ঘণ্টা পর চাতাল করে বা উঁচু মাটির পাত্রে রাখা হয়। এখানে পুঁটি, টেংরা, বাইম ও চিংড়ি এসব প্রজাতির মাছের শুঁটকি তৈরি করা হয়। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারি ধরে বিক্রি করা হয়।’

মাহতাবপুর গ্রামের শুঁটকি সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বছরে ছয় মাস আমরা শুঁটকি ব্যবসায় করি। অল্পদিনের হলেও এটি বেশ লাভজনক। শুঁটকিগুলো প্রক্রিয়াজাত করার পর দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারি দরে বিক্রি করি।’

বিশ্বনাথ উপজেলার মাহতাবপুর গ্রামের শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রে শুকানো হচ্ছে মাছ | ছবি: টাইমসবিশ্বনাথের লামাকাজি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. কবির হুসেন জানান, স্থানীয়ভাবে কীভাবে সম্ভাবনাময় এই শিল্পের উন্নয়ন করা যায় তা নিয়ে ২০২৪ সালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।  কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেটা আর বাস্তবায়ন হয়নি। আগামীতে এটা নিয়ে আবারও বসা হবে।

সারা দেশ থেকে রুই, কাতলা, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এখানকার আড়তে আসে। এরপর সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে শুঁটকি তৈরি করা হয়। এই শিল্পের সঙ্গে তিন উপজেলার শত শত মানুষ জড়িত। এই ব্যবসাকে আরও ত্বরান্বিত করতে সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

সিলেট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সীমা রাণী বিশ্বাস বলেন, এটা একটা বিশাল শিল্প। অসংখ্য মানুষ এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে, সরকারের পক্ষ থেকে এই শিল্পের উন্নয়নে কোনো বরাদ্দ নেই।

এ অবস্থায় গুণগত মান বজায় রেখে কীভাবে শুঁটকি উৎপাদন করা যায় তা নিয়ে উৎপাদনকারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা হচ্ছে।

যারা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত তাদের জীবনমান খুবই নিম্নমানের। গত বছর তাদের স্যানিটেশন ব্যবস্থার জন্য উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে কিছু কাজ করেছি। এই মুহূর্তে সরকারের কোনো প্রকল্প নেই। নতুন করে প্রকল্প এলে এই শিল্পের উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হবে বলেও জানান তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad