বাগেরহাটে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আটককৃত উপজেলা পর্যায়ের নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই নারীকে তার ঘরের ভেতর মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আর শিশুটির মরদেহ পাওয়া গেছে কাছেই। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে তদন্তকারীরা ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করছেন। তবে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে।
ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। তবে এর পরবর্তী ঘটনাগুলো জনমনে আরও বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সাদ্দাম বর্তমানে যশোর কারাগারে বন্দী আছেন। স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর তাদের শেষবার দেখার জন্য বা জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য তাকে প্যারোল দেওয়া হয়নি।
কর্তৃপক্ষ প্রথমে জানিয়েছিল, প্যারোলের জন্য কোনো আবেদন করা হয়নি। পরে জানা যায়, বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি পরিবারটিকে যশোর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত কোনো প্যারোল মঞ্জুর করা হয়নি। পরিবর্তে, মরদেহগুলো কারাগারের ফটকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সাদ্দাম তাদের শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পান।
কারাগারের গেটে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার ছবি ও বর্ণনা সারা দেশের মানুষকে বিচলিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ক্ষোভ ও দুঃখে ভরে ওঠে। সমালোচকরা এই ঘটনাকে রাষ্ট্রের অমানবিক আচরণের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অনেকে আবার সরকারের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন। অন্যদিকে, কর্মকর্তারা আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এই ব্যাখ্যা অনেককেই আশ্বস্ত করতে পারেনি।
ব্যাপকভাবে দেখলে, এই ঘটনা দুটি আন্তঃসম্পর্কিত বিষয়কে সামনে আনে। নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নেতিবাচক রূপ। এখানে যে নীতিটি ঝুঁকির মুখে তা অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন ব্যক্তি যদি সন্ত্রাসবাদ, হত্যা বা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধেও অভিযুক্ত হন, রাষ্ট্র তাকে ন্যায়সংগতভাবে বিচার করতে বাধ্য। যদি সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা না যায়, তবে আইন ও আদালতের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া যেমন রাষ্ট্রের কর্তব্য, তেমনি ওই ব্যক্তির নাগরিক অধিকার রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিচার মানে শুধু শাস্তি নয়, বরং সঠিক আইনি প্রক্রিয়া ও আইনের শাসন মেনে চলা।
প্যারোল না দেওয়ার পেছনে আমলাতান্ত্রিক অজুহাত দেখানোয় ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। বিদ্যমান নিয়মে জরুরি মানবিক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া আছে। এই ক্ষেত্রে, একটি সংবেদনশীল ও সাহসী প্রশাসন জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যমেই দ্রুত বিষয়টি সমাধান করতে পারত। এটি করতে ব্যর্থ হওয়া মানে আইনি ক্ষমতার অভাব নয়, বরং তা প্রয়োগ করার অনিচ্ছাকেই ইঙ্গিত করে।
এই ধরনের উদ্বেগ এবারই প্রথম নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আইনের প্রয়োগ হতো। তখন নির্বিচার গ্রেপ্তার, দীর্ঘ সময় আটকে রাখা এবং বন্দিদের পরিবারের কষ্টের প্রতি উদাসীনতার অসংখ্য অভিযোগ ছিল। নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং নীতিগত শাসনের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অনেকে এখন দাবি করছেন যে, সেই একই দমনমূলক ব্যবস্থা এখনো রয়ে গেছে। শুধু এখন লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রাজনৈতিক চরিত্রগুলো বদলেছে।
আটক থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের হেফাজতে মৃত্যুর খবর এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ভয় সৃষ্টি হচ্ছে, রাষ্ট্র কি ব্যক্তিগত জবাবদিহিতার বদলে গণশাস্তির দিকে ঝুঁকছে? এই ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারের নৈতিক ও আইনি সংস্কারের দাবিকে দুর্বল করে দেয়। অতীত থেকে প্রকৃত অর্থে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু নতুন কথা বললেই হবে না, আচরণেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে হওয়া অপরাধগুলোর তদন্ত ও শাস্তি হওয়া উচিত-এই বিষয়ে সবার ঐকমত্য আছে। জবাবদিহিতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সঠিক আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া জবাবদিহিতা আসলে বিচার নয়, বরং তা হলো প্রতিহিংসা। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব আইনি মানদণ্ড অনুযায়ী, অভিযোগ যতই গুরুতর হোক না কেন, প্রমাণ, স্বচ্ছতা এবং মানবিক আচরণ বজায় রাখা প্রয়োজন।
এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীর অসারতাকেও প্রকাশ করে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময় অনেক তরুণ কর্মী বড় নেতাদের নির্দেশে সহিংসতা ও অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল। বড় নেতারা ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং সুবিধা নিতে তাদের ব্যবহার করতেন। এখন সাদ্দামের মতো কর্মীরা পরিণাম ভোগ করছেন। অথচ যারা এই কাজের নির্দেশ দিয়েছেন বা সুবিধা ভোগ করেছেন, তাদের অনেকেই বিদেশে নিরাপদে আছেন। শাস্তির বোঝা এখন নিচুতলার কর্মী ও তাদের পরিবারের ওপর এসে পড়ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, তখন আশা করা হয়েছিল যে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তিত হবে। দেড় বছর পর সেই আশা এখন ক্রমে ফিকে হয়ে আসছে। প্রতিহিংসা, বিচারহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার ধরণগুলো এখন আগের মতোই পরিচিত মনে হচ্ছে।
রাজনীতি করার ধরন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতিতে অর্থবহ সংস্কার না এলে এ ধরনের ট্র্যাজেডি বারবার ঘটতে থাকবে–তা যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন। স্বর্ণালী ও তার শিশু সন্তানের মৃত্যু এখন কেবল একটি ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা যে, বিচারের জায়গায় প্রতিহিংসা স্থান করে নিলে তার মানবিক মূল্য কতটা চড়া হতে পারে।


